‘দেবতাদের আবাস ও উৎসবের দেশ’ নেপাল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই জনপ্রিয় উক্তিটি ব্রিটিশ পরিব্রাজক স্যার উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিকের। কাঠমাণ্ডু উপত্যকা সম্পর্কে বিখ্যাত মন্তব্যটি করেছিলেন তিনি। কারণ সেখানে ‘বাড়ির চেয়ে মন্দির, মানুষের চেয়ে দেবতা এবং বছরের দিনের সংখ্যার চেয়েও উৎসব সংখ্যা বেশি রয়েছে।’
০২.১১.০৫ সাল। কসমিক এয়ারওয়েজের ছোট্ট বিমানে কাঠমাণ্ডুু পৌঁছি। কাঠমাণ্ডুু এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে অপেক্ষমাণ ট্যুরিস্ট গাড়িতে চড়তে দেখি চালকের সামনে দুলছে গাঁদাফুলের মালা। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মনে হলো ভিন্ন এক জগতে আমরা। যে দিকে তাকাই সে দিকে রঙিন আর রঙিন, উৎসব আর উৎসব। গাড়ি শহর ছেড়ে আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করতে দেখি প্রত্যেক বাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের সামনের দেয়ালে, ওপরে, দরজা ও জানালার সামনে অসংখ্য গাঁদা ফুলের মালা। হোটেলে প্রবেশ করতে দেখি— হোটেল একই প্রকারের মালায় সজ্জিত হয়ে আছে। ঝুলানো মালা ছাড়াও পিতলের বৃহৎ পাত্রে পানি ভর্তি করে পানির ওপরে রাখা হয়েছে গাদা গাদা গাঁদা ফুল।
নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীদের গলায়, বগলে, মাথায়, কোমরে এমনকি হাতের লাঠিতেও পেঁচানো দেখেছি ফুলের মালা। গাঁদা ফুলের ইংরেজি নাম মেরিগোল্ড। কাঁচা হলুদের মতো উজ্জ্বল রঙ ও সৌরভের কারণে রূপচর্চায় দিন দিন এর কদর বাড়ছে। বাত, আমাশয় ও অর্শ রোগে, কাটা থেঁতলা থেকে রক্তপাত বন্ধ করতে গাঁদা ফুলের তুলনা নেই। পিষে, পুড়ে, চূর্ণ করে ঔষধি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। রূপচর্চায় ব্যবহার হয় তাজা ফুল। এর উজ্জ্বলতায় নাকি দেব-দেবীর নির্দেশে এত বেশি বেশি করে গাঁদা ফুলের ব্যবহার হয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি— দিওয়ালি উৎসব চলছে। হিন্দু ধর্মে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ ছাড়াও চাঁদের পূর্ণ তিথি, অর্ধতিথি ও অমাবস্যা, মহাপুরুষদের জন্ম-মৃত্যু— সবমিলিয়ে তিথিমুক্ত সাধারণ দিন খুঁজে পাওয়া খুব কষ্টকর। এদের পাহাড় দেয় পরিশ্রম আর উৎসব দেয় স্বস্তি, তাদের এক হাতে কর্ম এবং অপর হাতে স্ফূর্তি, ফুরসত নেই মোটেও।
ধর্মবিশ্বাস থেকে তাদের সব উৎসবের উৎপত্তি। তাদের মতে— জ্ঞানার্জন, লেখাপড়া, শীত, গ্রীষ্ম, শক্তি, বৃষ্টি, মাটির উর্বরতা, রোগবালাই ও বিপদাপদ— সবকিছুর জন্য পৃথক পৃথক দেব-দেবী আছে। তারা তুষ্ট হলে মানুষের কল্যাণ আসে, আর বিরূপ হলে বিপত্তি সৃষ্টি হয়। তাই ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবীকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে খুশি করতে একটার পর একটা উৎসব লেগে থাকে। এর মধ্যে যোগ হয়েছে সংস্কৃত-বিষয়ক উৎসবও। বর্ষবরণ ও বর্ষ বিদায়করণ, উৎসবগুলোর কোনটি ধর্মীয় আর কোনটি সংস্কৃতি-নির্ভর, পার্থক্য করা কঠিন।
শুধু ফুল নয়— ফুলের সাথে মিলিয়ে গায়ে মেখেছে রঙ এবং পরেছে রঙিন কাপড়। হলুদ ও লাল কাপড়ে ছেয়ে গেছে দেশটি। রঙিন পোশাক ছাড়া কোনো নারী খুঁজে বের করা দুষ্কর। সর্বাঙ্গে গাঁদা ফুলের মালা পেঁচিয়ে রঙিন বস্ত্র পরে শুধু হাঁটাহাঁটি করে না, নাচানাচিও করে। রঙিন বেশে দলবেঁধে ফুলের ডালা হাতে বাড়ি বাড়ি যায়। দোকান ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের সামনে গিয়ে ঢোল-তবলা-খঞ্জনীর তালে তালে নাচতে থাকে। এক বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা— সবাই নাচে, যে যেভাবে পারে; সে সেভাবে নাচে। কারো কণ্ঠে থাকে গানের ছন্দ আর মুখে থাকে হাসির ঝিলিক।
আমরা বাসে করে কাঠমাণ্ডুু ভেলির উঁচু পাহাড়টি ছাড়তে সামনে আসে একঝাঁক শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতী। চালক গাড়ি থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়। গাড়ির সামনে খেমটা নাচ শুরু করে। কিশোরী ও তরুণীরা জিন্সের প্যান্ট, ভারী সুতি গেঞ্জি পরে হাতের কনুই ওপরের দিকে বাঁকা করে নাচে। বাস থামিয়ে যখন নাচে তখন যাত্রীরা হাততালি দিতে শুরু করে। সেসব দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে জড়বস্তুর তৈরি কলম-কালি দিয়ে লেখালেখি করে বিশ্বাস করানো যাবে না। গাড়িচালক সহাস্যে পকেট থেকে ১০ টাকার একটি নোট যারা নৃত্য করেছে তাদের একজনের হাতে দিতেই হুড়মুড় করে এক পাশে সরে যায়। শুধু গাড়ির সামনে নয়— বাড়ি, প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র। কিছু দূর যাওয়ার পর আরেক দল, আবার থামিয়ে দেয় গাড়ি। একইভাবে নাচ দেখে ১০ টাকা গুনে গুনে গাড়িচালক মুক্তি পায়। পোখারা বাজারে ফল কিনতে গিয়ে এক দোকানের সামনে তরুণ-তরুণীদের নাচতে দেখে থমকে যাই। অপলক তাকিয়ে রই মায়াভরা মুখের অবিন্যস্ত নাচের দিকে। ডিস এন্টিনার কল্যাণে— বিশ্বের কোনো নাচ দেখা বাকি নেই। লাখো ডলার ব্যয়ে আয়োজিত নাচও দেখেছি, মনে রাখতে পারিনি। এক দিকে দেখি, আরেক দিকে ভুলে যাই। পাহাড়ের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেপালি মেয়েদের অবিন্যস্ত নাচ মন ও চোখ থেকে কখনো হারিয়ে যাবে না। মধ্য সেপ্টম্বরে পালন করা হয় ইন্দ্রযাত্রা। আকাশের দেবতা ইন্দ্র। ইন্দ্র খুশি থাকলে ঠিকমতো মেঘ-বৃষ্টিসহ সবুজ হয়ে উঠবে ফসলের মাঠ। সপ্তাহব্যাপী চলে এই উৎসব।
লন্ডন, আরব, ভারত, মালয়েশিয়াসহ যত দেশে গেছি, সেসব দেশের মধ্যে গরিব রাষ্ট্র নেপাল। তারপরও ওই সব দেশের চেয়ে বেশি সুখী মনে হয়েছিল নেপালিদের। বিশ্বে একমাত্র হিন্দু রাজ্য নেপাল। যে দেশের ৮২ শতাংশ হিন্দু। হিন্দু ধর্মে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ ছাড়াও চাঁদের পূর্ণ তিথি, অর্ধতিথি ও অমাবস্যা, মহাপুরুষদের জন্ম-মৃত্যু— সবমিলিয়ে তিথিমুক্ত সাধারণ দিন খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাদের পাহাড় দেয় পরিশ্রম, উৎসব দেয় স্বস্তি। তাদের এক হাতে কর্ম এবং অপর হাতে স্ফূর্তি, ফুরসত নেই মোটেও। এ কারণে বলা হয়, নেপাল ইজ কলড ‘হোম অব গডস অ্যান্ড ল্যান্ড অব ফেস্টিভালস।
ইউরোপের বহু দেশে গেছি, সবার মুখে যেন বিষণ্নতার ছাপ। আনন্দের সাগরে ভাসতে থাকা নেপালিদের ভুলতে পারছিলাম না। এ আনন্দ এবং প্রকৃতির বিরল সৌন্দর্য দেখতে বিশ্বের পর্যটকরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নেপালে। পর্যটকদের জন্য নেপাল ভ্রমণও সোজা, যেকোনো দিক দিয়ে প্রবেশকালে পাসপোর্টে সিল দিলেই চলে, ‘যার নাম পোর্টএন্টি ভিসা’।
এই হাসির দেশে প্রথম কান্না শুরু হয় ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে। শুরু হয় শোকের মাতম। ভূমিকম্পের পর নেপালের যে দিকে চোখ যায় সে দিকে আগুন। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় পোড়া গোশতের গন্ধ। সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে সারি সারি চিতা। কুড়িয়ে পাওয়া কাঠখড়ের আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনের লাশ। পানি নেই, চরম খাদ্যসঙ্কট। রাস্তায় পচা লাশ। দুর্গন্ধে বাতাস ভারী, সর্বত্র বিভীষিকাময় চিত্র। নতুন পর্যটক যাওয়া বন্ধ, পুরনো পর্যটকরা নেপাল ছেড়ে পালাচ্ছেন। কারণ ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে— এ কম্পন শেষ নয়, এর চেয়েও ভয়াবহ কম্পনের অপেক্ষা। ৭ দশমিক ৯ রিখটারের কম্পন যেখানে আনন্দনগরী নিমিষে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। নেপাল পরিণত হয়েছিল তখন শ্মশানভূমিতে।
এক যুগ পার হতে না হতে গত ২৬ আগস্ট ২০২৬, উত্তর সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে দেশজুড়ে এক গভীর শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজারো মানুষ মারা গেছে। এখনো চার সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ আছেন। নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে শত শত শোকসন্তপ্ত পরিবার এখন তাদের আত্মার শান্তির জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে।
বর্তমানে পাহাড়ের ঢালগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে। অতিবৃষ্টি ছাড়া যেকোনো মুহূর্তে বিশাল আকৃতির ভূমিধস ঘটার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলে এমন তিন হাজার ৬২৪টি হিমবাহ হ্রদ আছে, যার মধ্যে অন্তত ৪৭টি হ্রদ যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকিতে আছে। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিবিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, নেপালের সাম্প্রতিকতম অনেক বন্যার ঠিক আগে কোনো স্থানীয় ভারী বৃষ্টিপাত ছিল না। পাহাড়ের চূড়ায় বরফ বা পাথরধসে এসব বন্যা হয়। প্রচলিত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা এ ধরনের ‘বৃষ্টিহীন বন্যা’ আগে থেকে শনাক্ত করতে পারে না, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর জন্য বিজ্ঞানীদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ আছে।
নেপালের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান দু’টি টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান এবং ইউরেশিয়ান প্লেট) সংযোগস্থলে। ২০১৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর ভূ-পদার্থবিদরা গবেষণা করে দেখেছেন, মাটির নিচের ফাটল বা রাপচার জোনটি হিমালয়ের আরো গভীরে চলে গেছে, যা আগে বিজ্ঞানীরা অসম্ভব ভাবতেন। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, হিমালয় অঞ্চলে সঞ্চিত শক্তির কারণে ভবিষ্যতে আট বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পরে, যার ক্ষয়ক্ষতি ২০১৫ সালের চেয়েও বহুগুণ বেশি হবে।
এবার ঘরের কথা বলি। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, ২০১৫ সালে ৭ দশমিক ৯ রিখটারের ভূমিকম্পে নেপালে যে ক্ষতি হয়েছিল, সমপরিমাণ ভূমিকম্পে আমাদের ঢাকা হয়ে উঠতে পারে অগ্নিকুণ্ড। কারণ ঢাকা নগর বড় ধরনের ভূমিকম্পনের কবলে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে যত মানুষ মারা যাবে, তার কয়েকগুণ মারা যাবে আগুনে পুড়ে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। কারণ ভূমিকম্পের পর গ্যাসলাইনের পাইপে বিস্ফোরণ ঘটবে, আর সেই আগুনে পুরো নগর দাউ দাউ করে জ্বলবে। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে আক্রান্ত মানুষকে উদ্ধারের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাকসুদ কামাল বলেছিলেন, ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে তাতে আধা ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধারকাজ শুরু করা গেলে ৯০ শতাংশ মানুষকে বাঁচানো যাবে। উদ্ধারকাজ শুরু করতে এক দিন লাগলে ৮১ শতাংশ, দুই দিন লাগলে ৩৬ শতাংশ, তিন দিন লাগলে ৩৩ শতাংশ মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। উদ্ধারকাজ শুরু করতে যত বেশি বিলম্ব হবে, মৃতের সংখ্যা তত বাড়বে।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
adv.zaomi;anedon@gmail.com