ম. হামিদুল হক মানিক
শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পরিবর্তন আসে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা এবং সর্বোপরি মানুষের আচরণ ও মূল্যবোধে পরিবর্তন আনতে হয়। এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং ধারাবাহিকতা।

পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকারকে দীর্ঘ সময় ধরে মূলত রাষ্ট্রের ভেতরে জমে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে একের পর এক আন্দোলন, ঘেরাও, দাবি-দাওয়া, রাজনৈতিক চাপ এবং নানা ধরনের অস্থিরতা। ফলে সরকার যেটুকু সময় পেয়েছে, তার বড় অংশ গেছে পরিস্থিতি সামলাতে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু তরুণের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলন, ঘেরাও, চাপ সৃষ্টি ও দাবি আদায়ের পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু অভিযোগও জনপরিসরে এসেছে।

অবশ্যই আন্দোলনের সাথে যুক্ত সবাইকে একই চোখে দেখা উচিত নয়। তরুণদের অনেকেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে এসেছেন, এটিই বাস্তবতা। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সেই আকাঙ্ক্ষার সাথে অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার প্রদর্শন ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা যুক্ত হয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সমস্যাটি শুধু দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। দুর্নীতির প্রভাব প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রাষ্ট্রের এই ক্ষয় শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি গভীর আস্থার ক্ষয়। মানুষ যখন দেখে নিয়ম না মেনে চললেই সহজে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান হওয়া যায়, তখন আইন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় সামাজিক বিশৃঙ্খলার অধ্যায়।

সম্প্রতি বিদ্যুতের বিল বেশি আসায় জনৈক তরুণ ফেসবুক লাইভে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গালিগালাজ করেছেন, এমন অভিযোগে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনার অধিকার একজন নাগরিকের আছে। বিদ্যুতের বিল বেশি কেন, গ্যাসের চাপ কম কেন, লোডশেডিং কেন, কিংবা দ্রব্যমূল্য বাড়ছে কেন— এসব প্রশ্ন জনগণ করতেই পারে। সরকারের নীতির বিরোধিতা করা, প্রতিবাদ করা কিংবা কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সমালোচনা আর ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমান এক নয়। বিদ্যুতের বিল বাড়লে প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিয়ে সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে দরের ওঠানামা, আমদানি, সরবরাহব্যবস্থা, ভর্তুকি, বিতরণব্যবস্থা এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক হিসাব। তাই বিল বেশি এলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে? প্রতি ইউনিটের মূল্য কত? আগের মাসের তুলনায় ব্যবহার কতটা বেড়েছে? গ্যাসের সঙ্কটের কারণে কি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়েছে? নাকি ট্যারিফ বা অন্য কোনো পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে? প্রশ্ন করুন, হিসাব চান, সরকারের জবাবদিহি দাবি করুন। কিন্তু গালিগালাজ নয়।

রাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্যে কাউকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনই শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করাও সমীচীন নয়। আইনের প্রয়োগ হতে হবে নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ ও আইনের বিধিবদ্ধ ধারার ভিত্তিতে, ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করা যেমন অনুচিত, তেমনই সাধারণ নাগরিককে অপমান করাও অনুচিত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনশৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। আইনের প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগ হবে, তবে শাস্তি যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়। একই অপরাধে এক ব্যক্তির জন্য এক আইন এবং ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির জন্য অন্য আইন— এমন দ্বৈত মানদণ্ড থাকলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।

সমস্যার আরেকটি দিক আরো গভীর। আমাদের সমাজে শ্রদ্ধাবোধ ও পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটুকু অনেকটা বদলে গেছে। স্কুল-কলেজ জীবনে কোনো শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ বা মুরুব্বিকে সামনে দেখলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই একটু সরে দাঁড়াতাম, সামাজিক সঙ্কোচ ছিল। বড়দের সামনে কিভাবে আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে একটি প্রথাগত সংস্কৃতি ছিল।

এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই সামাজিক সঙ্কোচটুকু হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই সমাজের রূপান্তর ঘটে না। নাগরিকদের আচরণ, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা এবং পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার যেমন দরকার, তেমনি সেই স্বাধীনতার সাথে দায়িত্ববোধ থাকাও সমান জরুরি।

বিদ্যুতের বিলের প্রসঙ্গে আসা যাক। বর্তমানে দেশজুড়ে চোরাই লাইনে চলা লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ দেয়া এবং গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। তাই একটি পরিবারের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গেলে শুধু বিদ্যুতের ইউনিটের দামকে দায়ী করলে পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন, আমদানি ব্যয় এবং বিতরণ ব্যবস্থার ওপরও বিদ্যুতের মূল্য নির্ভর করে। বৈশ্বিক সঙ্ঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়ে। তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই কথা। ফলে গালিগালাজ করলে জ্বালানির দাম কমবে না কিংবা সরবরাহ বাড়বে না।

ঢাকার লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা দরকার। বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষায় কোথাও যদি রেশনিং করতে হয়, তবে তার প্রভাব কিছুটা পড়বেই। দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া নগরবাসীকে যদি সাময়িক অসুবিধা সহ্য করতে হয়, তবে তা কেন হচ্ছে সরকারকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর নাগরিকদেরও সেই ব্যাখ্যা বুঝে যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে শহরে কিছুটা লোডশেডিং করা হলে তা নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা থাকতে পারে, তবে তা গালিগালাজের মাধ্যমে নয়।

তবে সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাজারের দিকে তাকালে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। শীত আসার আগেই বাজারে প্রচুর সবজি উঠতে শুরু করেছে। ঢাকার আশপাশের অঞ্চল থেকে ভ্যানভর্তি লাউ বাজারে আসছে এবং ২০ টাকায়ও লাউ পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় টমেটো হিমাগার থেকে বাজারে আসতে শুরু করেছে, যার দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। একইভাবে হিমাগারের আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদন যখন পর্যাপ্ত হয় এবং সরবরাহব্যবস্থা ঠিক থাকে, তখন তার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারদরে। এসব ঘটনা ছোট মনে হলেও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সঠিকভাবে কাজ করলে বাজারে সরবরাহ বাড়ে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। একটি দেশের অর্থনীতি মূলত এভাবেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলে।

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা অনেক সময় ভাবি, সরকার পরিবর্তন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবতা তা নয়। রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হলে প্রশাসন কার্যকর করতে হবে, দুর্নীতি কমাতে হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হবে, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এসব কাজ স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়। দরকার রাজনৈতিক স্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়ার মতো স্বাধীন গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। প্রয়োজন দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

প্রধানমন্ত্রীর কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে সমালোচনা করুন, তার নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। সরকারের নীতি ভুল মনে হলে বিকল্প প্রস্তাব দিন। কিন্তু ব্যক্তিগত অশালীন আক্রমণ কখনোই না। আজ আপনি যাকে গালিগালাজ করছেন, কাল আপনার পছন্দের কোনো মানুষকেও অন্য কেউ একই ভাষায় আক্রমণ করবে। তখন প্রতিবাদের অধিকার আর ব্যক্তিগত অপমানের সীমারেখা কোথায় দাঁড়াবে— সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন হয়ে যাবে।

সভ্য সমাজে ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা যায়, রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যায়। তবে সেই বিরোধিতার ভাষা হতে হবে যুক্তি, তথ্য ও শালীনতায় মার্জিত। দেশ চলে শৃঙ্খলায়, আইনের শাসনে, জবাবদিহি ও নাগরিক দায়িত্বশীলতায়; পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে।

আমরা এমন সমাজ চাই, যেখানে জনগণ প্রশ্ন করবে, প্রতিবাদ করবে, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখবে। একই সাথে তরুণরা শিক্ষককে সম্মান করবে, বয়োজ্যেষ্ঠকে মর্যাদা দেবে, ভিন্নমত সহ্য করবে এবং আইন মেনে চলবে। সরকার বদলানো সহজ; কিন্তু রাষ্ট্রের সংস্কৃতি বদলানো কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করছেন।

লেখক : চিত্রশিল্পী; নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)