বাংলাদেশের নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ
আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় পাহাড়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের আশঙ্কা ও ভারী অস্ত্রের মজুদ
Printed Edition
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন আর কেবল ওপারের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট নয়, বরং তা বাংলাদেশের দোরগোড়ায় এক জটিল ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) বাংলাদেশসংলগ্ন সীমান্তের মংডু, বুথিডং এবং চিন রাজ্যের পালেতোয়া অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পুরোটাই এখন আরাকান আর্মির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি-ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে রাষ্ট্রীয় কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবাধ আনাগোনা ও তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
রোহিঙ্গাদের জোর করে রিক্রুটমেন্ট ও অস্ত্রের চালান
সীমান্তের ওপারে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর আরাকান আর্মি কৌশলগত কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আশ্রয়ের লোভ দেখিয়ে ও বলপ্রয়োগ করে অন্তত এক হাজার রোহিঙ্গাকে ওপারে নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং তাদের জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া মাদকের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্রের চালান প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে ক্যাম্পকেন্দ্রিক তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে এসব অস্ত্র ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে।
পাহাড়ে ত্রিদেশীয় অক্ষ ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ
বান্দরবান সীমান্তের মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমার অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির তত্ত্বাবধানে ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ চলছে। সেখানে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যরা যৌথ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বলে জানা যায়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে যে, ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে আরাকান আর্মি, ইউপিডিএফ এবং কেএনএফ গোপনে একজোট হয়েছে। এর ফলে কক্সবাজার থেকে বান্দরবান ও রাঙামাটি পর্যন্ত দীর্ঘ পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন এক অস্থিতিশীল করিডোর তৈরি হচ্ছে।
খুমি জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র তৎপরতা ও কেএনসিপি-কেএনপির উপদ্রব
মিয়ানমারের পালেতোয়া টাউনশিপ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর স্থানীয় খুমি সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও জোর করে রিক্রুটিং শুরু হয়। ১২ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া এবং নারীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগে খুমি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম নেয়। এই সুযোগে মিয়ানমার সরকারের মদদে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় খুমি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ‘খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (কেএনসিপি) ও ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (কেএনপি) নামের দুটি সশস্ত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এই দুটি গোষ্ঠী বর্তমানে বান্দরবানের অভ্যন্তরে অস্ত্রসহ অবাধে যাতায়াত করছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য নতুন এক বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জেলে অপহরণ ও সেন্টমার্টিন নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা
সীমান্তে আরাকান আর্মির আধিপত্য বাড়ার পর থেকেই বাংলাদেশী জেলেদের ওপর হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বিজিবির মধ্যস্থতায় অনেকে ফিরে এলেও এখনো ৬৬ জন বাংলাদেশী ও ২১ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারের কারাগারে বন্দী। পাশাপাশি, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া জেলেদের দাবি- আরাকান আর্মি সেন্টমার্টিন দ্বীপকে রাখাইনের অংশ দাবি করে তা দখলের হুমকি দিয়েছে। যদিও টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া এই দাবিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন।
নাফ নদী সীমান্তে বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের রুট পরিবর্তিত হয়েছে। আরাকান আর্মির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এই মাদক বাণিজ্যের বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থলপথের কড়াকড়ির ফলে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ মাদক পাচার হচ্ছে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী ও আনোয়ারার সমুদ্রপথ দিয়ে।
সরকারি ও বিজিবির কৌশলগত পদক্ষেপ
সীমান্তের এই বহুমুখী ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে নজরদারির জন্য নাইট ভিশন ও থার্মাল প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ড্রোন মোতায়েন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সিলেট সেক্টরে পৃথক ড্রোন যুদ্ধ প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করা হয়েছে এবং ১০৯ কিলোমিটার নতুন কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। চোরাচালান, পুশইন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরো কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।