গ্রেগ পেন্স

সাম্প্রতিক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সামরিক সঙ্ঘাতের সাক্ষী হয়েছে। সঙ্ঘাত হয়েছে ইরান আর পশ্চিমা আশীর্বাদপুষ্ট ইসরাইলের সাথে। এই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আঞ্চলিক গতিধারাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা খুব কম লোকই কল্পনা করতে পেরেছিল। ইরান-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ দুর্বল করতে এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার লক্ষ্যে পরিচালিত এই যুদ্ধ ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের পরিকল্পনাকারীদের কল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত ফলাফল এনে দিয়েছে। এতে ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার সেই লক্ষ্য অর্জন শুধু ব্যর্থ হয়নি; বরং তা আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি ইরানের সাথে কূটনীতি এগিয়ে নেয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই ঘটনাবলি মূলত কূটনীতির পরিবর্তে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতিকে উপেক্ষা করে একতরফা, অদূরদর্শী নীতির ফল। আমেরিকান ও ইসরাইলি প্রত্যাশার বিপরীতে প্রতিদ্ব›দ্বীদের প্রতি আক্রমণাত্মক নীতির কৌশলগত ব্যর্থতার ফলে নতুন মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠিত হচ্ছে।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, কূটনৈতিক পরাজয়

ইরানের সাথে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইসরাইল আবারো তার সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। মার্কিন লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভুল হামলা ইরানকে প্রাথমিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। প্রথম নজরে এই সামরিক সাফল্য ইসরাইলের জন্য একটি বড় বিজয় বলে মনে হয়েছিল। এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনীর ফলে এ অঞ্চলে ইসরাইলের অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তার সম্পূর্ণ বিপরীত প্রভাব পড়েছে। আক্রমণের মাত্রা ও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহত হওয়ার ঘটনা পুরো আরব জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের ঢেউ তোলে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো যারা আগে আব্রাহাম চুক্তির অধীনে ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিকীকরণের পদক্ষেপ নিয়েছিল এখন তারা এই নীতিগুলো পুনর্মূল্যায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলি ও আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের এ অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি অবহেলার কারণেই এটি ঘটেছে। তারা ধরে নিয়েছিলেন, সামরিক আধিপত্যের মাধ্যমে স্বাভাবিকীকরণের বাধা ভেঙে যাবে। কিন্তু এ ধারণা আজকের জটিল মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এর ফলে এই সামরিক শক্তি প্রদর্শন আরব দেশগুলোকে ইরানের আরো কাছে নিয়ে এসেছে, যা ফিলিস্তিনিদের সমর্থক হিসেবে তার ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে আরো আঞ্চলিক সহানুভূতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই পেশিশক্তি দেখিয়েছে যে, কূটনৈতিক ভিত্তি ছাড়া সামরিক বিজয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে কেবল ব্যর্থই হয় না, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের সাথে কূটনীতির দিকে ঝুঁকছে

যুদ্ধের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত পরিণতিগুলোর একটি হলো, ইরানের সাথে আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান কূটনীতি। সঙ্ঘাতের পর ইরান এবং সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে গোপন আলোচনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই আলোচনার লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা স¤প্রসারণ। এই পরিবর্তন বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি নতুন উপলব্ধির উদ্ভব ঘটায়। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আনতে সামরিক নীতির ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করার পর আরব রাষ্ট্রগুলো এখন উত্তেজনা কমাতে ইরানের সাথে যোগাযোগ শুরু করছে এবং পুনর্গঠিত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করার উপায় হিসেবে দেখছে।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই কূটনৈতিক অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তেহরানের সাথে বছরের পর বছর ধরে তীব্র বিরোধ জারি রাখার পর রিয়াদ অনুধাবন করেছে, অব্যাহত শত্রুতামূলক নীতি তাদেরকে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অতীতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আলোচনা বারবার স্থগিত হয়েছে। কিন্তু এখন তা নতুন গতিতে এগিয়ে চলেছে। এ ঘটনাবলি ইঙ্গিত দেয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসী কৌশল ইরানকে দুর্বল করেনি; বরং এই অঞ্চলে তার কূটনৈতিক অবস্থান আরো উন্নত করেছে। এই নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে ইরান পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমেরিকার একতরফা নীতি

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে ইসরাইলের প্রধান সমর্থক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ইসরাইলের প্রতি এই সমর্থন যা মার্কিন আঞ্চলিক আধিপত্যকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তা বিপরীতমুখী ফলাফল এনেছে। ওয়াশিংটনের একতরফা নীতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অবস্থান শক্তিশালী করার পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথে সম্পর্ক হ্রাস করেছে। একসময় মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল আরব দেশগুলো এখন এই নির্ভরতা কমাতে সক্রিয়ভাবে তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক পরিবর্তন করছে। এই প্রবণতা বিশেষ করে মিসর ও জর্দানের মতো দেশগুলোতে স্পষ্ট, যারা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার। ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের আমেরিকান নীতি কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার মূল্য দিয়ে এসেছে। যুদ্ধের মানবিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করা ও মধ্যস্থতার জন্য আরবদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এই শূন্যতা চীন ও রাশিয়াসহ অন্যান্য পক্ষের জন্য আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ এনে দিয়েছে। এই পরিবর্তনে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কৌশলগত ব্যর্থতা প্রতিফলিত হয়। কূটনীতির চেয়ে সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তার প্রভাব হ্রাস করেছে।

নতুন মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠন : সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ থেকে উদ্ভূত নতুন মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রত্যাশার চেয়ে অনেকটাই ভিন্নভাবে রূপ নিচ্ছে। এ অঞ্চলটি বহুমেরুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে কোনো একক খেলোয়াড় তার আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। সক্রিয় কূটনীতি ও ফিলিস্তিনি স্বার্থের পক্ষে সমর্থনের মাধ্যমে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মোড়ল হিসেবে তার ভূমিকা জোরদার করতে সক্ষম হয়েছে। এ দিকে ইসরাইল তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সত্তে¡ও ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হচ্ছে।

এই নতুন মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আঞ্চলিক কূটনীতির উত্থান। যেসব আরব রাষ্ট্র একসময় বিদেশী সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল তারা এখন পশ্চিমা শক্তি থেকে স্বাধীনভাবে জোট গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। যদিও এ প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিক বিরোধ এবং অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, তবুও এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনা রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যারা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের আধিপত্য আরো দৃঢ় করার আশা করেছিল, তাদের জন্য এটি একটি কৌশলগত পরাজয়ের সমান।

আধিপত্যবাদী বিভ্রমের সমালোচনা

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধে একটি কঠোর সত্য উন্মোচিত হয়েছে। তা হলো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ভূরাজনৈতিক আধিপত্য প্রদান করতে পারে- এই বিভ্রম আমেরিকান ও ইসরাইলি লক্ষ্য অর্জনে শুধু ব্যর্থ হয়নি, বরং প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রতিদ্ব›দ্বীদের শক্তিশালী করছে এবং তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠন করছে। এ অঞ্চলের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতার ওপর ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের একতরফা, আক্রমণাত্মক নীতি কম গুরুত্ব দেয়ার ফলে ইরানের কূটনৈতিক অবস্থান আরো বাড়িয়ে তুলেছে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোকে তেহরানের আরো কাছে টেনে এনেছে। কূটনীতির চেয়ে কঠোর ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়া ও আঞ্চলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করার প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে এই কৌশলগত ব্যর্থতা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি প্রত্যাশার বিপরীতে নতুন মধ্যপ্রাচ্য একটি বহু-মেরু অঞ্চল যেখানে কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রাধান্য পাবে। আরব দেশগুলো সামরিকীকরণের অসারতা স্বীকার করে ইরানের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করছে এবং পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করছে। এ ঘটনাপ্রবাহ আমেরিকান ও ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। সামরিক প্রভাব বিস্তারের বর্তমান পথে চলতে থাকলে তা কেবল আরো বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্বল প্রভাবের দিকে পরিচালিত হবে। এই নতুন মধ্যপ্রাচ্য ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের নকশার ফসল নয়; বরং তাদের অদূরদর্শী, একতরফা কৌশলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধের ফলাফল।

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর নাজমুল ইসলাম শিবলি