কোনো ভোট নেই, কোনো উৎসব নেই, নেই কোনো প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাও- অথচ এক প্রজ্ঞাপনে বদলে গেল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের শীর্ষ নেতৃত্ব। গত ৩০ জুন আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক বিশেষ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটি নির্বাচিত কাউন্সিলের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে সম্পূর্ণ সরকারি পছন্দে গঠিত ১৫ সদস্যের এক ‘অ্যাডহক’ বা সাময়িক কমিটি। ওই কমিটির বেশির ভাগ সদস্য বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী অথবা দলটির প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িত আইনজীবী; অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে দু’জন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং একজন জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি। তবে এ প্রক্রিয়ার সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, একটি নির্বাচিত বার কাউন্সিলের পরিবর্তে মনোনীত পরিষদ গঠন করা হলেও, নির্বাচন না হওয়ার প্রশ্নে জনপরিসরে কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য বিতর্ক দেখা যায়নি। আইন মন্ত্রণালয় হিসাবি কৌশলে বিএনপির বাইরে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট অল্পসংখ্যক আইনজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে পরিষদটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, একই সাথে এর গঠন নিয়ে সম্ভাব্য সমালোচনাও অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে গেছে। অন্য রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত আইনজীবীদের জন্য মাত্র তিনটি আসন বরাদ্দ করে সরকার কার্যত সমালোচনার তীব্রতা অনেকখানি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবী পেশার সর্বোচ্চ বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া, পেশাগত শৃঙ্খলা তদারক এবং আইনজীবী সমাজের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও পেশাগত সততা রক্ষা- এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির ওপর ন্যস্ত। আর একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য স্বাধীন আইনজীবী সমাজের অস্তিত্ব অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, উভয় দল আইনজীবী পেশার ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট ছিল। তাদের প্রতি রাজনৈতিকভাবে সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা এ নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে চেয়েছে। এর প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে বার কাউন্সিলের ভর্তিসংক্রান্ত মৌখিক পরীক্ষায়। বহু ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের কাছে এমন প্রশ্ন করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য তাদের আইনি জ্ঞান বা পেশাগত যোগ্যতা যাচাই করা নয়; বরং তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, আনুগত্য কিংবা কোন মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল তা নির্ণয় করা।
ক্ষমতায় থাকাকালে আইনি পেশার ভেতরে নিজের প্রভাব সুসংহত করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি সফল হয়েছিল। এর ফলে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারেও সম্ভবত এ বিশ্বাস জন্মেছে যে, দেশের কর্মরত আইনজীবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই আশঙ্কাই যে বার কাউন্সিল নির্বাচন না দিয়ে, তার পরিবর্তে নিজেদের বেছে নেয়া অনুগত মনোনীতদের নিয়ে একটি ‘অ্যাডহক’ কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্তে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকের এ নিবন্ধে আমরা মূলত এই অ্যাডহক বাংলাদেশ বার কাউন্সিল গঠনের আইনি বৈধতা ও যৌক্তিকতা পরীক্ষা করে দেখব।
বর্তমান অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে ২০২১ সালে কার্যকর হওয়া একটি আইনের অধীনে। মূলত কোভিড-১৯ মহামারীর ফলে সৃষ্ট নজিরবিহীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। মহামারীর বিধ্বংসী প্রভাব থেকে দেশ যখন ধুঁকে ধুঁকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন আয়োজন করা কোনোভাবে সম্ভব ছিল না। এ সঙ্কট কাটাতে ২০২১ সালের ২৮ জুলাই রাষ্ট্রপতি ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স, ২০২১’ জারি করেন, যার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল বার কাউন্সিল আদেশের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধানে সরকারকে ক্ষমতা দেয়া হয়, যদি মহামারী, অতিমারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (অ্যাক্ট অব) কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সরকার একটি অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠন করতে পারবে। পরবর্তীকালে সংসদের অধিবেশন শুরু হলে, ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওই অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি আইন পাস করা হয়। সংশোধিত বিধানটি স্থায়ী আইনি ভিত্তি পায়। সংশোধিত ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রথমবার প্রয়োগ করা হয় ২০২১ সালের ৩ আগস্ট, যখন ১৯তম অ্যাডহক বাংলাদেশ বার কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল।
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের জুন মাসে দ্বিতীয়বারের মতো এ আইনের প্রয়োগ করা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর এটি ছিল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা অনুষ্ঠানে বর্তমান বিএনপি-নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দৃশ্যত স্বস্তিদায়ক অবস্থানে ছিল না। এর কারণ হলো, গত প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ওই আমলে একটা কথা চাউর ছিল যে, আইনি পেশায় যুক্ত হওয়া বা লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করত; যেখানে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীলরা বিশেষ সুবিধা পেতেন। আর বিএনপি বা জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত আইনজীবীরা চরম বৈষম্যের শিকার হতেন। এমন বাস্তবতায় সরকারের অভ্যন্তরে এবং বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে এ উদ্বেগ তৈরি হয় যে, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বার কাউন্সিলে আবারো আওয়ামী-সমর্থিত আইনজীবীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সম্ভবত সে কারণে নির্বাচনের পথ এড়িয়ে সরকার মনোনীত সদস্যদের সমন্বয়ে এক বছরের জন্য একটি অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠনের পথ বেছে নেয়।
যদিও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দলটির সমর্থক আইনজীবীদের বার কাউন্সিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কোনো অযোগ্যতা বা আইনি বাধা নেই। ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন এই বাস্তব জটিলতাকে সামনে নিয়ে আসে। সে সময় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত দু’টি আইনজীবী সংগঠন- সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ এবং বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সীমিত পরিমণ্ডলে আইনজীবী সমাজে কারা বর্তমানে বা অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তা শনাক্ত করে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় একজন আইনজীবীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে আইনগতভাবে বিরত রাখা আদৌ বৈধ কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নও এখানে জড়িত। এ বাস্তবতা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের প্রেক্ষাপটে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার বার কাউন্সিলের নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে এক বছরের জন্য একটি অ্যাডহক (অস্থায়ী) বাংলাদেশ বার কাউন্সিল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যেসব কারণে এই অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, সেগুলো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। নৈতিকভাবেও সমর্থনযোগ্য নয়। বিদ্যমান আইন সরকারকে মাত্র চারটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠনের ক্ষমতা দিয়েছে- যখন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয় না (১) মহামারী, (২) অতিমারী, (৩) প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অথবা (৪) অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতিতে। স্বাভাবিকভাবে, প্রথম তিনটি কারণের কোনোটি বর্তমান পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একই সাথে সরকার এমন কোনো নির্দিষ্ট ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’র কথাও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, যার কারণে বার কাউন্সিলের নির্বাচন আয়োজন অসম্ভব। অবাক করার বিষয় হলো, খুব কমসংখ্যক আইনজীবী প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। যদিও অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী আকন্দ এ প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করেছেন, তবে সুপ্রিম কোর্টের মামলা-মোকদ্দমা সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন; তারা ভালো করে জানেন, তার করা রিট আবেদনগুলো আদালতপাড়ায় খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয়া হয় না। বিএনপির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, প্রায় দুই দশক ধরে আইনজীবী পাড়ায় আওয়ামী লীগের যে প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ভেঙে দিতে চাওয়াটা রাজনৈতিকভাবে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একটি অন্যায়ের প্রতিকার আরেকটি অন্যায়ের মাধ্যমে কখনো সম্ভব নয়। নির্বাচিত বার কাউন্সিলের পরিবর্তে অনির্বাচিত একটি অ্যাডহক পরিষদ বসিয়ে দেয়া কিংবা আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ আইনজীবীদের বাদ দিয়ে বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীদের সংখ্যা বাড়িয়ে আইনজীবী সমাজের ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা- এসব কেবল সেই একই রাজনৈতিক চর্চাকে দীর্ঘায়িত করে, যা বহু বছর ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে। এ সমস্যার একমাত্র টেকসই সমাধান হলো এমন একটি প্রকৃত স্বাধীন বার কাউন্সিল, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে আইনজীবীরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। যে প্রতিষ্ঠান সব রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকার ও আইনজীবী সমাজের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তবে কোনো সরকার কি আইনজীবী পেশার ওপর প্রভাব বিস্তারের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে প্রস্তুত হবে?- সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি।