মক্কা চুক্তির মূলনীতি হলো— সদস্য কোনো রাষ্ট্র সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের সাথে এর মিল থাকলেও চুক্তির সামরিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, সদস্যদের বাধ্যবাধকতা এবং সম্ভাব্য নতুন সদস্য গ্রহণের শর্ত এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ এখনো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির কেবল বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বাস্তবতা বিবেচনা করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে; অর্থাৎ এটি এখনো সম্ভাবনা ও নীতিগত আগ্রহের পর্যায়ে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত যদি বাংলাদেশকে প্রকাশ্যে সতর্ক করে থাকে যে, মক্কা চুক্তিতে যোগদান ‘বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ হবে, তবে তা অবশ্যই আপত্তিকর ও উদ্বেগজনক। কারণ বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তুলবে— সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তের ওপর ভেটো দিতে পারে না বা হুমকির ভাষায় তা প্রভাবিত করার অধিকার রাখে না। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সতর্কতা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও প্রকাশ্য সরকারি বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মুখে ‘মক্কা চুক্তিতে যোগদান বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হবে’— এমন সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মূলত বলা হয়েছে, তারা বাংলাদেশের আগ্রহসংক্রান্ত পরিস্থিতি ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে। জয়শঙ্কর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন; কিন্তু সেটিকে সরাসরি মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হলে বক্তব্যটির যথার্থতা যাচাই করা জরুরি। সামাজিকমাধ্যমে প্রচার হওয়া কোনো উদ্ধৃতি আর ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এক বিষয় নয়।
তার পরও ‘ভারত পরিস্থিতি নজরে রাখছে’— এ ভাষাটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ কোনো অধীন রাষ্ট্র নয় যে তার প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ভারত পর্যবেক্ষণ করবে এবং অনুমোদন বা আপত্তি জানাবে। ভারত তার নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করতেই পারে, যেমন, বাংলাদেশও ভারত-ইসরাইল, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু পর্যালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ এক বিষয়; আর বাংলাদেশকে সতর্ক করা, চাপ দেয়া বা পরিণতির ভয় দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ভারতের উদ্বেগের একটি কারণ হতে পারে মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা, কাশ্মির বিরোধ, একাধিক যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত যেকোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোকে নয়াদিল্লি সন্দেহের চোখে দেখবে। বাংলাদেশ সেখানে যুক্ত হলে ভারত সেটিকে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু ভারতের পাকিস্তাননীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করতে পারে না। পাকিস্তানের সাথে ভারতের বিরোধ আছে বলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক বা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রাখবে না— এমন দাবি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
একইভাবে ভারত যখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরাইলের সাথে ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করে, উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন সামরিক জোট ও কৌশলগত কাঠামোয় অংশগ্রহণ করে, তখন বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী হিসেবে সেই সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করার দাবি জানায় না। সার্বভৌম সমতার নীতি দুই দেশের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের পক্ষে বেশ কিছু যুক্তি আছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের প্রধান উৎসগুলোর একটি। তুরস্ক দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পের অধিকারী এবং বাংলাদেশের সাথে তার সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ হচ্ছে। পাকিস্তানের রয়েছে বৃহৎ ও অভিজ্ঞ সশস্ত্রবাহিনী, প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক শক্তি। এই তিন দেশের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, সামরিক প্রযুক্তি, যৌথ উৎপাদন, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এ ধরনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্পও সম্প্রসারণ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেশীর অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে। বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে এবং কোনো একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’— এই নীতির অর্থ কোনো একটি শক্তির প্রভাববলয়ে বন্দী থাকা নয়; একাধিক অংশীদারের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের আপত্তি আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অতীত অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে। সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টনে দীর্ঘসূত্রতা, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘকাল সমর্থন দেয়া— এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ভারত যদি আস্থা পুনরুদ্ধার না করে উল্টো বাংলাদেশের নতুন অংশীদার নির্বাচনের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করতে চায়, তবে সম্পর্ক আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে ভারতের আপত্তি অগ্রহণযোগ্য বলেই বাংলাদেশকে আবেগের বশে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়া উচিত— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এটি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি; কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সংস্থা নয়। এর সদস্যপদ বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের সামরিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করতে হবে। পাকিস্তান-ভারত সঙ্ঘাত, সৌদি আরব-ইরান উত্তেজনা কিংবা তুরস্কের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে বাংলাদেশকে অংশ নিতে হবে কি না— সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। তিন প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-অগ্রাধিকারও এক নয়। পাকিস্তানের প্রধান কৌশলগত উদ্বেগ ভারত; সৌদি আরবের নিরাপত্তা-চিন্তা উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক; আর তুরস্কের স্বার্থ সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ককেশাশ, রাশিয়া ও ন্যাটোর সাথে সম্পর্কিত। এগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ নিরাপত্তা-হুমকি নয়। অন্য কোনো দেশের যুদ্ধের দায় বহনের বিনিময়ে বাংলাদেশ বাস্তবে কতটুকু নিরাপত্তা পাবে— সেটি মূল্যায়ন না করে চুক্তিতে যাওয়া উচিত হবে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌম সমতা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করার কথা বলে। প্রতিরক্ষামূলক জোটে অংশগ্রহণ এই নীতির পরিপন্থী নয়। কিন্তু এমন কোনো ধারা গ্রহণ করা যাবে না, যা বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও জাতীয় সংসদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ছাড়াই দেশকে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ, সংসদে আলোচনা, সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করা আবশ্যক। সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কি স্বয়ংক্রিয় হবে, নাকি জাতীয় সংসদের অনুমোদন লাগবে? বাংলাদেশের সৈন্য বিদেশে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে কি? পারমাণবিক প্রতিরোধের সাথে কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি হবে কি? চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার বিধান কী? অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কেমন? এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশকে একই সাথে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। তৈরী পোশাকের প্রধান বাজার পশ্চিমা বিশ্বে; চীন বৃহৎ বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন অংশীদার; মধ্যপ্রাচ্য রেমিট্যান্স ও জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস; আর ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, নদী, যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের ফলে এসব সম্পর্ক, রফতানি, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা প্রবাসী শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, হিসাব করতে হবে। বাংলাদেশের যথাযথ জবাব হওয়া উচিত শান্ত, দৃঢ় ও কূটনৈতিক। ঢাকা বলতে পারে, ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ শুনতে বাংলাদেশ প্রস্তুত; কিন্তু নিজের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণের সার্বভৌম অধিকার নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের সাথে টেকসই বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার পথ হলো সম্মান ও সমতা— চাপ ও অভিভাবকসুলভ আচরণ নয়।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক