বিদ্যুৎবিল বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের ঘটনায় গাজীপুরে সিফাত আবদুল্লাহ নামে এক কলেজছাত্রকে হাসিনা আমলের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা পুরনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে হেফাজতে নেয়া হয়। এ ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে একটি পুরনো অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাক-স্বাধীনতার সীমা কোথায়? একজন নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার কতদূর। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের বা ক্ষমতার সীমারেখা কোথায়?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এখানে দু’টি পৃথক বিষয় প্রায়ই এক করে দেখা হয়। একটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। অন্যটি অশালীনতা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ। প্রথমটি গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। দ্বিতীয়টি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও আইনগত বিষয়। কিন্তু এই পার্থক্য নির্ধারণে ভুল হলে এক দিকে গালিগালাজকে বাকস্বাধীনতা বলে বৈধতা দেয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্য দিকে অশালীনতার অজুহাতে বৈধ সমালোচনাও দমনের পথ খুলে দেয়।
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক এবং বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সেই সাথে দেয়া হয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও। তবে এই স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে এবং আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধে প্ররোচনায় আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগও সংবিধানে রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ একজন নাগরিক সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাঠামোর সমালোচনা করতে পারেন। কোনো সরকারি সেবার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। প্রতিবাদ করতে পারেন। এমনকি ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়েও তীব্র ভাষায় আপত্তি জানাতে পারেন। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্বস্তিকর মতামতের জায়গা থাকতে হয়। এক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের সমালোচনার সুযোগ না থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন।
কিন্তু সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তের সমালোচনা এবং ব্যক্তিকে গালিগালাজ এক নয়। বিদ্যুৎবিল কেন বেড়ে গেল। বিলের হিসাবে অসঙ্গতি কোথায়। জনগণের ওপর এর প্রভাব কী। এসব প্রশ্ন তোলা নিঃসন্দেহে বৈধ নাগরিক অধিকার। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্রহনন বা কুরুচিপূর্ণ আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা নিছক নীতির সমালোচনা থাকে না। ব্যক্তির সম্মানহানির বিষয়টি সামনে চলে আসে।
সিফাতের ঘটনায় তার ক্ষোভের কারণ এবং এর প্রকাশের পদ্ধতি, দু’টিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। বিদ্যুৎবিলের অসঙ্গতি বা অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে অভিযোগ সত্য হলে তা নিশ্চয় তদন্তের দাবি রাখে। আবার ভাষা অশালীন হয়ে থাকলে তার নৈতিক ও আইনগত দায়ের প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু একটি অশালীন বক্তব্যের জবাবে রাষ্ট্র যে ব্যবস্থা নেবে, তা হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক।
এখানেই মূল উদ্বেগ। কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। ফ্যাসিস্ট হাসিনা জমানায় আমরা দেখেছি, কিভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী খাদিজাকে ইন্টারনেটে শুধু একটি টকশো হোস্টিং করার ঠুনকো অভিযোগে দীর্ঘ দিন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র কিভাবে তার জামিন ঠেকিয়ে রেখেছিল তাও আমরা দেখেছি।
কোনো বক্তব্য অপরাধ কিনা তা নির্ধারণের আগে দেখতে হবে, সেটি ঠিক কী ছিল। তার উদ্দেশ্য কী ছিল। কোন আইনের কোন ধারা এতে প্রযোজ্য। এর ফলে বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা কতটুকু ছিল।
বিশেষ করে মতপ্রকাশ ঘিরে গ্রেফতার ও পুলিশি হেফাজতে নেয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত সতর্কতা সমীচীন। আইন প্রয়োগ যদি অপরাধ দমনের পরিবর্তে নাগরিকের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, এর ক্ষতি খুব গভীর হয়। একজন মানুষ যদি মনে করেন, সরকারের সমালোচনা করলে, কোনো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করলে, কিংবা অপ্রিয় মতপ্রকাশে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। তাহলে তিনি কথা বলার আগে সাতবার ভাববেন। নিজেকে থামিয়ে দেবেন। এভাবে সমাজে জন্ম নেয় সেলফ-সেনসরশিপ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের ক্ষতিকর সংস্কৃতি।
পতিত শেখ হাসিনা আমলে আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যথেচ্ছ ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের যে অপসংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই সময়ের কোনো আইন বা মামলাকে বর্তমানে প্রয়োগ করা হলে তার বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই পুরনো কোনো মামলায় কাউকে গ্রেফতার দেখানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আরো বেশি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। তা না হলে হিতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। এতে নাগরিকদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। তবে এর অর্থ এ নয় যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা খুশি তাই বলা যাবে। ডিজিটাল মাধ্যমের একটি বক্তব্য মুহূর্তে হাজার বা লাখ মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার, সহিংসতার উসকানি কিংবা কারো সুনাম ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক দায়িত্বও অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।
কোনো নাগরিক অশোভন ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে তার অভিযোগের বাস্তবতা অগ্রাহ্য করা অনুচিত। বিদ্যুৎবিল অস্বাভাবিক বেড়ে থাকলে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। হিসাবের স্বচ্ছতা আছে কিনা পরখ করতে হবে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রতিকার করতে হবে। এটি সরকারের দায়িত্ব। ক্ষোভের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষোভের কারণ নির্মূল করা যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণেও পরিবর্তন প্রয়োজন। নাগরিককে অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখা অন্যায়। পুলিশের ক্ষমতার অর্থ নাগরিককে ভয় দেখানো নয়। নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন দু’টির সুরক্ষা দেয়াই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ ধরনের ঘটনায় বিচার বিভাগের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বক্তব্য আইন লঙ্ঘন করেছে কিনা। করলে কোন ধারা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের নেয়া ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কিনা। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ বিচারিক পর্যালোচনা থাকা দরকার।
রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো— কোনো বক্তব্য জনপরিসরে অস্বস্তিকর হলেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। গণতন্ত্রে ক্ষমতাবানদের সহনশীলতার পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন। যে বক্তব্য সরকারের পছন্দের, তার স্বাধীনতা রক্ষা সহজ। প্রকৃত পরীক্ষা সেই বক্তব্যের ক্ষেত্রে, যা সরকারকে বিব্রত করে। প্রশ্নবানে জর্জরিত করে। কিংবা তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলে দেয়।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের প্রত্যাশা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। একটি ভিন্ন রাষ্ট্রচর্চা। সেই রাষ্ট্রে নাগরিক প্রশ্ন করবেন। প্রতিবাদ করবেন। সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করবেন। কখনো সেই ভাষা তীব্র হতে পারে। সেই অস্বস্তিকর কণ্ঠস্বর সহ্য করার সক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকতে হবে।
বাকস্বাধীনতা এমন একটি অধিকার, যার সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি এর দায়িত্বশীল চর্চাও উপেক্ষার নয়। নাগরিকের দায়িত্ব ক্ষোভকে যুক্তিতে রূপ দেয়া। ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে নীতির সমালোচনা করা। নিজের বক্তব্যের সামাজিক ও আইনগত পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কতজন ভিন্নমতাবলম্বীকে গ্রেফতার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেটিই, যে নাগরিকের তীব্র বা কটু সমালোচনাও অনায়াসে সহ্য করে। অপরাধ হলে প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেয়। আর ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নিজেকে সংযত রাখে। কারণ বাকস্বাধীনতার প্রকৃত সীমারেখা শুধু নাগরিকের মুখে নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতায়ও টানা থাকে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com