মোহাম্মাদ হাসান নাসির
বিশ্ব যখন যুদ্ধ, মেরুকরণ আর অবিশ্বাসে জর্জরিত, তখন কূটনীতি শব্দটি প্রায়ই মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ, স্বার্থের সমীকরণ আর কঠোর দরকষাকষির কথা। অথচ আজ থেকে চৌদ্দ শ’ বছরেরও বেশি আগে আরব উপদ্বীপে একজন আল্লাহর নবী দেখিয়েছিলেন, কূটনীতি হতে পারে সম্মান, সহনশীলতা আর ন্যায়বিচারের ভাষায় লেখা এক শান্তির দলিল। হিজরি নবম সালের সেই অধ্যায়টি ইতিহাসে পরিচিত ‘আমুল উফুদ’ বা প্রতিনিধিদলের বছর নামে, যখন আরবের ৭০টিরও বেশি গোত্র ও সম্প্রদায় থেকে দূত এসেছিলেন মদিনায়, মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা:-কাছে।

কূটনীতি যখন ধর্মীয় দায়িত্ব
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কূটনীতি নিছক রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব, যার উৎস কুরআন ও সুন্নাহ। এই কাঠামোকে ইসলামী আইনশাস্ত্রে বলা হয় ‘সিয়ার’- যা যুদ্ধ ও শান্তি, চুক্তি, রাষ্ট্রদূতের মর্যাদা এবং অমুসলিমদের অধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, শত্রু যদি শান্তির প্রস্তাব দেয়, তা গ্রহণ করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। (সূরা আল-আনফাল, ৮ : ৬১) অর্থাৎ শান্তিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অবস্থা, যুদ্ধ কেবল ব্যতিক্রম, আত্মরক্ষা বা নিপীড়ন হলো প্রতিরোধের শেষ উপায়।

এই তত্ত্বীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ইসলামী কূটনীতি কয়েকটি মূলনীতির কথা বলে— শান্তিপ্রিয়তা, ন্যায়বিচার ও সমতা, চুক্তির প্রতি আনুগত্য, পারস্পরিক সম্মান, বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান, কূটনৈতিক অভ্যর্থনা এবং পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলানোর নমনীয়তা। কিন্তু তত্ত্ব যতটা সহজ, তার বাস্তব প্রয়োগ ততটাই কঠিন। আর ঠিক সেখানেই ‘আমুল উফুদ’ হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠ।

যখন মদিনায় এলো ৭০-এর বেশি প্রতিনিধিদল
মক্কা বিজয়ের পর আরবের রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। একে একে গোত্রগুলো মদিনার নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে আসে। হিজরি নবম সালে সেই স্রোত পৌঁছায় সর্বোচ্চে— ৭০টিরও বেশি প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে রাজনৈতিক আনুগত্য জানাতে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে কিংবা নিছক ধর্মীয় আলোচনার জন্য।

রাসূল সা: প্রতিটি দলের জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুত রাখতেন ‘কুব্বাতুল উফুদ’ নামের একটি তাঁবু। প্রতিনিধিদের ভাষা, পোশাক ও সংস্কৃতির প্রতি দেখানো হতো পূর্ণ সম্মান। এই ছোট্ট আচরণটুকুই আসলে বড় বার্তা বহন করত— আগন্তুক যেন নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার বোধ নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। আধুনিক কূটনীতির ভাষায় একে বলা যায় আস্থা-নির্মাণের প্রথম ধাপ, যা ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টেকে না।

নজরানের চুক্তি : সহাবস্থানের এক দলিল
‘আমুল উফুদ’-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটি বোধ হয় নজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদলের সাথে সম্পাদিত চুক্তি। সেই চুক্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছিল তাদের জীবন, ধর্ম, সম্পত্তি ও উপাসনালয়ের পূর্ণ সুরক্ষা। কোনো ধর্মগুরুকে পদচ্যুত করা হবে না, কোনো গির্জা ভাঙা হবে না, কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হবে না— বিনিময়ে কেবল সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি কর দিতে হবে। চৌদ্দ শ’ বছর আগের একটি রাষ্ট্র যখন সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্বাধীনতাকে লিখিতভাবে নিশ্চয়তা দেয়, তখন তা নিছক ইতিহাসের পাতায় থেমে থাকে না— আজকের বহুত্ববাদী বিশ্বের জন্যও তা এক জোরালো দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

কূটনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নির্মাণের প্রক্রিয়া
শুধু ধর্মীয় সহনশীলতা নয়, এ সময়েই স্বাক্ষরিত হয় নিরাপত্তা, কর ব্যবস্থা, সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মতো বাস্তব বিষয়ে একের পর এক লিখিত চুক্তি। এসব চুক্তি ছিল স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য— অনেকটা আজকের আন্তর্জাতিক চুক্তির আদি রূপের মতো।

দায়িত্ব পেয়েছিলেন তরুণরাই
লক্ষ করার বিষয়, এই কূটনৈতিক কর্মযজ্ঞের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়েছিল তরুণদের হাত দিয়ে। মাত্র ২০ বছর বয়সে মুয়াজ ইবনে জাবাল রা:-কে পাঠানো হয় ইয়েমেনে শিক্ষক ও শাসক হিসেবে। মুসআব ইবনে উমাইর রা:-কে দেয়া হয় মদিনায় দাওয়াতি ও কূটনৈতিক দায়িত্ব। বার্তাটি স্পষ্ট— কূটনীতি কোনো নির্দিষ্ট বয়সের বিষয় নয়; বরং আস্থা ও যোগ্যতার বিষয়। রাসূল সা: তরুণদের ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তা আজকের যুব নেতৃত্বের জন্যও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়, আমরা কি তরুণদের হাতে সেই দায়িত্ব ও আস্থা তুলে দিচ্ছি?

আজকের তরুণদের জন্য কী শিক্ষা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিংয়ের এই যুগে ‘আমুল উফুদ’-এর মডেল থেকে তরুণরা অন্তত চারটি শিক্ষা নিতে পারে। প্রথমত, সহিংসতা বা মেরুকরণের বদলে সংলাপ ও সফট পাওয়ারকে অগ্রাধিকার দেয়া। রাসূল সা: আরবের উগ্র গোত্রগুলোকে অস্ত্র নয়, আলোচনার টেবিলে বসিয়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে কূটনৈতিক সেতু হিসেবে ব্যবহার করা— ছাত্রবিনিময়, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান আর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কিং সম্পর্ক গড়ার শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণ-নেতৃত্বাধীন কূটনীতি বা ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসির’ চর্চা করা। আর চতুর্থত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— সম্মান ও মর্যাদার ভাষায় কথা বলা। কেননা, যেকোনো টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি আসলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

শেষ কথা
‘আমুল উফুদ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে কার্যকর কূটনীতি জন্ম নেয় ক্ষমতার প্রদর্শনী থেকে নয়; বরং সম্মান, ধৈর্য আর দূরদর্শী প্রজ্ঞা থেকে। আজকের বিশ্ব যখন বিভাজন আর অবিশ্বাসে ভুগছে, তখন চৌদ্দ শ’ বছর আগের এই মডেল— সংলাপ, ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদী সহাবস্থান আর তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা— হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের শান্তি ও উন্নয়নের একটি বাস্তব দিকনির্দেশনা।

লেখক পরিচিতি : নিরাপত্তা বিশ্লেষক; সভাপতি, এনডিজে (বেসামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান)

nasir308@gmail.com