মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় লেখাপড়া করে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশ পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো-ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২১ হাজার ৮৬টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৫৭টি বেসরকারি, যা মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সংস্থার আরেকটি তথ্য, দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাদে মঞ্জুরিকৃত নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা ৩১ হাজার ৯১২টি। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৫৮০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। এমপিওবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৩৩২টি। উল্লিখিত তথ্য বলে দেয়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার ভূমিকা কী।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে। ফ্যাসিবাদী জমানায় শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ওই নিয়ম বাতিল করে সংশোধিত বিধিমালায় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাতিল করে দেয়। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি নির্বাচনের নিয়মাবলিতে ফের ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধি’ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির যে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

নয়া দিগন্তের খবর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে গত রোববার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদ গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে।

ফ্যাসিবাদী জমানায় দলীয় পরিচয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা শিক্ষার পরিবেশ কলুষিত করেছিল। শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল পরিচালনা পর্ষদ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের সংস্কারটি ছিল শিক্ষাঙ্গনকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। লক্ষ্য ছিল পেশাদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে নিশ্চিত করে বলা যায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেয়ার অর্থ হলো— শিক্ষাঙ্গনে ফের মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যের প্রাধান্য দেয়া। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্র হতে পারে না। সেখানে প্রাধান্য পাওয়া উচিত শিক্ষানুরাগী, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের, যারা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দোহাই দিয়ে যদি পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক নেতাদের এসব পদে বসানোর পথ উন্মুক্ত করা হয়; তাহলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার আশা ফের ব্যাহত হবে। যদিও এ পদে অন্যদের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম এলে অন্যদের এই পদে বসার সুযোগ খুব কম হবে, এটি সহজে অনুমেয়।

শিক্ষাব্যবস্থা দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি দেশের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত এই প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার আগে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও মানসম্মত রাখতে মেধা ও যোগ্যতানির্ভর প্রবিধানমালা বহাল রাখা প্রয়োজন।