ব্রি. জে. (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট তখনই তৈরি হয়, যখন শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রাসাদ যত উঁচু হয়, মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নেতৃত্ব তত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সত্যটি খুবই সরল, ক্ষমতা মানুষের জন্য, মানুষ ক্ষমতার জন্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ছয় মাসের রাজনৈতিক আচরণ ও কিছু সিদ্ধান্ত এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে ব্যাপক পরিবর্তনের ধারা চোখে পড়ে। বিষয়টি শুধু তার সাদামাটা পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দাফতরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে ‘মাননীয়’ বা এ ধরনের সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহার করতে বলেছেন, সেই সাথে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানো, সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়ানো, তার ছবি সংবলিত কোনো ব্যানার ব্যবহার না করা, নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখা, সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করে রাস্তা বন্ধ না করা, আহত সেনাসদস্য বা দলীয় কর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া এসব ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মতো একটি প্রাক-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ দশকের অধিককাল চলমান ক্ষমতার সাথে যুক্ত প্রচলিত দূরত্ব ও জৌলুশ কমিয়ে আনার বার্তা দিচ্ছেন।
একইরকম বার্তা পাওয়া যায় তার ব্যক্তিগত আচরণেও। পোশাকের সাধারণত্ব, জনসমক্ষে অনাড়ম্বর উপস্থিতি এবং তুলনামূলক সংযত আচরণকে তাই কেবল তার ব্যক্তিগত রুচি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সেটিও ক্ষমতা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন ক্ষমতার দৃশ্যমান চাকচিক্য কমান, নিজেকে বিনয়ের সাথে উপস্থাপন করেন, তখন সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অনেকাংশে কমে যায়।
তবে গত ছয় মাসে সম্ভবত আরো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তার রাজনৈতিক ভাষায়। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, হুমকি, বিদ্রƒপ এবং প্রতিপক্ষকে প্রায় শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের ভাষায় অভ্যস্ত। সেই বাস্তবতায় সংসদ কিংবা সংসদের বাইরে বিরোধী পক্ষের অমার্জিত কটাক্ষ, সমালোচনা ও উদ্বেগের জবাবে তারেক রহমানের তুলনামূলক সংযত, শালীন ও গঠনমূলক শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এবং জনমনে তার রুচি ও শিষ্টাচার বোধের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ উপস্থাপন করেছে। তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতার ভাষায় না নিয়ে রাজনৈতিক ভাষাতেই মোকাবেলার যে প্রবণতা দেখাচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনৈতিক discourse-এ আগামী দিনে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।
তবে এর প্রভাব শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। ক্ষমতার শীর্ষে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীরাও সেটিকেই রাজনৈতিক আচরণের মডেল হিসেবে অনুশীলন করে। বিপরীতে শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত থাকে, ভিন্নমতকে রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিরোধীদের উদ্বেগের জবাব শালীনভাবে দেয়, তবে দলের তৃণমূলেও একটি ভিন্ন বার্তা যায়। দেশের সঙ্ঘাতপ্রবণ রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই পরিবর্তিত tone-setting-এর সম্ভাব্য প্রভাব তাই ব্যক্তিগত শিষ্টাচারের চেয়ে অনেক বড়। এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ কিংবা মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যেও ভাষা কিংবা আচরণে ক্রমশ শালীনতা এবং বিনয়ের ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। আড়ম্বর দিয়ে সাময়িক বিস্ময় তৈরি করা যায়, মানুষের আস্থা অর্জন করা যায় না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ধারার একটি শক্তি ছিল মানুষের কাছে যাওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা। শহীদ জিয়া দেশের প্রতিটি প্রান্তরে মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যেও ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের একটি আধুনিক প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ— রাজনীতি তাহলে কাদের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তরও শুধু বক্তৃতায় নয়, কাজে দিতে হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি উদ্যোগের কেন্দ্রে তাই আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেটি হলো— সরকারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা, জনসেবা সহজ করা। সরকারের কর্মকাণ্ড মানুষের বাস্তব চাহিদার সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ সফল হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে; তা হলো, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাওয়া।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল চায়। তারা জানতে চায় না সরকার কী বলছে, তারা দেখতে চায় সরকার কী করছে। একজন কৃষক সার, কীটনাশক পাচ্ছেন কি না, তার উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, ব্যবসায়ীরা হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারছেন কি না, একজন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না, মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছে কি না। এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত Performance Indicator।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিনয়ের সম্ভবত আরো তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হলো সরকারের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার না করা। ১৫ বছরের অধিক দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে সেবা দেয়া সম্ভব হয়নি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা রয়েছে। সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি এ ধরনের বাস্তবতা স্বীকার করার রাজনৈতিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রচলিত ক্ষমতার সংস্কৃতিতে সরকার সাধারণত নিজের সাফল্য তুলে ধরে, ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকারের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। সেই জায়গায় তারেক রহমান অকপটে প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা সংসদে জানিয়েছেন এবং জনগণের কাছে আরো সময়, সহযোগিতা চেয়েছেন। এটি দুর্বলতা নয়; বরং রাজনৈতিক বিনয়ের (Humility) জোরালো প্রকাশ। এই Humanization of Power বাংলাদেশের অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশাল বিবর্তনের ইঙ্গিতবহ।
তারেক রহমানের সাদামাটা পোশাক, প্রটোকলে সংযম, প্রতিপক্ষের প্রতি পরিমিত ভাষা কিংবা সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার— এ সব বিষয়কে আলাদাভাবে দেখলে সম্ভবত পুরো চিত্রটি অনুধাবন করা মুশকিল। বাংলাদেশের মতো একটি সঙ্ঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একসাথে দেখলে এগুলো ক্ষমতা সম্পর্কে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার ইঙ্গিত বহন করে। তারেক রহমানের এই ক্ষমতার প্রদর্শন না করে পরিমিত ব্যবহার, প্রতিপক্ষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করা এবং নিজের অবস্থানকে অভ্রান্ত না ভেবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে নতুন সূর্যের আভা দৃশ্যমান হবে।
ইতিহাস কোনো সরকারের গাড়িবহর, প্রটোকল কিংবা ক্ষমতার জৌলুশ মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে, কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কে তাদের কণ্ঠ শুনেছিল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি ছিল, কে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল এবং কে রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করেছিল।
তাই আজকের রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ক্ষমতা কার হাতে, তা নয়। তারেক রহমানের গত ছয় মাসের পদক্ষেপগুলো অন্তত একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে, বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতার জৌলুশ থেকে মানুষের আস্থার দিকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে প্রতিষ্ঠানমুখিতার দিকে এবং কথার রাজনীতি থেকে কাজের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলঙ্কার কোনো বিশেষণ নয়, সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হলো মানুষের আস্থা।