মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে শুধু ইরান-ইসরাইলের সঙ্ঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধের পরিধি এখন ইসরাইলের সীমানা ছাড়িয়ে পারস্য উপসাগর, ইয়েমেন, ইরাক, লোহিত সাগর এবং সৌদি আরব পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রশ্নটি তাই আর শুধু ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ কত দিন চলবে তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো— এটি কি শেষ পর্যন্ত ইরান ও সৌদি আরবের যুদ্ধে পরিণত হবে?
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলছে, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ১১ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হিসেবে সৌদি তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ পথ। একই সময়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাবের কাছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মক্কা বন্দর ও পারিম দ্বীপ দখলে নিয়েছে।
অর্থাৎ ইরানের প্রভাববলয়ের সাথে যুক্ত শক্তিগুলো একই সময়ে সৌদি আরবকে উত্তর, দক্ষিণ ও সমুদ্রপথ— তিন দিক থেকেই চাপে ফেলছে।
যুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট : সৌদি আরব
ইরান যদি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তবে তার সামনে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। সামরিক শক্তিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই ইরানের শক্তির বড় উৎস অসম যুদ্ধ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ার— কম খরচে প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর বড় ক্ষতি করা।
এখানে সৌদি আরব কি তেহরানের আদর্শ টার্গেট হতে পারে? সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক। তেলক্ষেত্রগুলো শুধু সৌদি অর্থনীতির প্রাণ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি তেল যদি নির্বিঘ্নে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে না পারে, তবে তার প্রভাব শুধু রিয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; লন্ডন, দিল্লি, ঢাকা থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রায় সব অর্থনীতিতে পড়বে।
ফলে সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা সামরিক হামলার চেয়েও বড় কৌশলগত অর্থ বহন করে। কিন্তু এতে লাভবান হবে কে? কার রক্ত ঝরবে?
সৌদি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই পাইপলাইনে প্রতিদিন প্রায় চার-পাঁচ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। হরমুজ যখন অস্থিতিশীল, তখন এই পাইপলাইনে আঘাত সৌদি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় সঙ্কেত। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো— হামলার উৎস হিসেবে ইরাকের মায়সান অঞ্চলের কথা এসেছে। সেখানে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও হামলার পেছনে ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা বলেছেন। যদিও ইরান হামলার দায় স্বীকার করেনি।
এখানেই বিপদের মূল জায়গা। সৌদি নেতৃত্ব যদি ধরে নেয় যে, ইরান সৌদি অর্থনীতিকে যুদ্ধের অংশ বানাচ্ছে, তবে রিয়াদের পক্ষে সংযত থাকা কঠিন হবে।
হুথিরা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র মনে করা ভুল হবে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের নিয়ন্ত্রণ মানে বাব আল-মান্দাবের ওপর প্রভাব। আর বাব আল-মান্দাব শুধু একটি সামুদ্রিক প্রণালী নয়। এটি ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ দরজা।
হুথিদের অগ্রগতি তাই সৌদি আরবের জন্য দুই ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে। প্রথমত, সৌদি ভূখণ্ডের দক্ষিণ সীমান্তে সামরিক চাপ। দ্বিতীয়ত, সৌদি তেল রফতানির সমুদ্রপথে চাপ। আইএসডব্লিউর বিশ্লেষণ বলছে, হুথিদের মক্কা ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রগতি বাব আল-মান্দাবের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাদের লক্ষ্য কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দখল নয়; সমুদ্রপথের ওপর কৌশলগত লিভারেজ অর্জনও হতে পারে।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মনে রাখা দরকার। হুথিরা ইরানের মিত্র হলেও তারা ইরানের সরল ‘প্রক্সি’ নয়। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য রয়েছে। তাই তেহরান ও সানার স্বার্থ এক হলেও সব ক্ষেত্রে তারা অভিন্নভাবে পরিচালিত হবে— এমন নাও হতে পারে।
তবু বৃহত্তর কৌশলগত ফলাফল একই : ইরানের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ছে।
সৌদি কি সরাসরি ইরানের সাথে যুদ্ধ করবে
সম্ভাবনা আছে; কিন্তু রিয়াদ সম্ভবত প্রথম পছন্দ হিসেবে সেটি নেবে না। কারণ সৌদি আরব জানে, সরাসরি যুদ্ধ মানে তেল স্থাপনা, বন্দর, বিমানঘাঁটি, শহর এবং সমুদ্রপথ— সব কিছুকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা।
রিয়াদের জন্য আরো বড় সমস্যা হলো— ইরানের সাথে যুদ্ধ হলে সৌদি অর্থনীতির ভিশন ২০৩০ প্রকল্পগুলো ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়বে। পর্যটন, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, নতুন শহর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য— সবই স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
সুতরাং সৌদির স্বাভাবিক কৌশল হবে প্রতিরোধ, মিত্রতা এবং নির্বাচিত পাল্টা আঘাত। কিন্তু যুদ্ধের যুক্তি সবসময় রাষ্ট্রের পছন্দ অনুযায়ী চলে না। একটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেল স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা বেসামরিক প্রাণহানি রিয়াদকে যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
৮ সেপ্টেম্বর হুথিদের হামলায় দক্ষিণ সৌদির তেল ও অর্থনৈতিক স্থাপনা আক্রান্ত হয়েছে এবং ৭৩ জন আহত হয়েছে। জাজানের চার লাখ ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতার রিফাইনারিতেও আগুন লেগেছে। এ ধরনের হামলা চলতে থাকলে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ ও ‘সরাসরি যুদ্ধে’র মধ্যে সীমারেখা দ্রুত মুছে যেতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আসল পরীক্ষা
এখানে ৭ আগস্টের সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন তাৎপর্য পায়। চুক্তিটি যদি নিছক রাজনৈতিক ঘোষণা না হয়ে কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামোতে পরিণত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু এখন রিয়াদ একই সাথে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক করতে চাইছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছে এবং সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা রক্ষায় যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। অর্থাৎ ইরান-সৌদি সঙ্ঘাত শুরু হলে সেটি শুধু দুই দেশের লড়াই থাকবে না।
এর সাথে যুক্ত হতে পারে— সৌদি আরব+পাকিস্তান+তুরস্ক বনাম ইরান+ইরাকের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী+হুথি। আর এর ওপরে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নিজস্ব সামরিক হিসাব।
এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের সমীকরণ তুরস্ক ও পাকিস্তান চাইছে বলে মনে হয় না। ইসরাইল ও আমেরিকা শুরু থেকে ইরানের সাথে যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোকে পক্ষ বানাতে চেয়েছিল। তুরস্ক ও পাকিস্তান চেষ্টা করেছে সেটি যাতে না হয়। এখন এর দ্বিতীয় ধাপের চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
বড় প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্র কোথায় থাকবে
ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে পরিত্যাগ করবে না। কিন্তু সরাসরি ইরান-সৌদি যুদ্ধে প্রবেশ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সাথে সঙ্ঘাতে ব্যাপক সামরিক সম্পদ ব্যবহার করছে। একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব— দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ রক্ষার দায়িত্ব নিতে হলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির চাপ বহুগুণ বাড়বে।
এখানে ইরানের কৌশলগত সুবিধা হলো ভূগোল। হরমুজের উত্তর তীরে ইরান। বাব আল-মান্দাবের কাছে হুথি। ইরাকে রয়েছে ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়া। সিরিয়া-লেবানন ফ্রন্টে ইরানের দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ তেহরানের কাছে একাধিক ফ্রন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবের সমস্যা উল্টো, তার অর্থনীতি বিশাল হলেও ভূগোল তাকে তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
চীন : পরাজিত মধ্যস্থতাকারী নাকি নতুন শক্তি
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। সেই উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের বিকল্প এবং চীনের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। আজকের যুদ্ধ সেই সমীকরণকে কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এখানে চীনের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। চীন যদি সৌদি ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার দরজা খোলে, তবে বেইজিং নিজেকে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা-সংলাপের অপরিহার্য শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনেও চীন উপসাগরীয় যুদ্ধ নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামরিক শক্তিতে সঙ্কট নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, চীন সেখানে কূটনীতিকে এগিয়ে রাখছে।
ইসরাইলের জন্যও কি সৌদি-ইরান যুদ্ধ লাভজনক
উত্তর—হ্যাঁ। ইরান যদি সৌদি আরবের সাথে সরাসরি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে তেহরানের সামরিক ও রাজনৈতিক মনোযোগ বিভক্ত হবে। ইসরাইলের ওপর সরাসরি চাপ কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিষয়টি ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে। কারণ সৌদি আরব যদি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করে এবং একই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক প্রতিযোগিতা শুরু হবে।
তাতে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার বদলে অঞ্চলটি আরো অস্ত্রসজ্জিত হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পশ্চিমা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য ইসরাইলের মিত্রদেরও দিতে হবে। তবে ইসরাইল যুদ্ধ করে যে লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিল তার অনেক কিছু যুদ্ধ না করে অর্জন করতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্র
গত এক দশকে একটি বিভাজন তৈরি হয়েছে, ইরান বনাম সৌদি-আমেরিকা অক্ষ। ইরান-সৌদি সঙ্ঘাত শুরু হলে সেই পুরনো বিভাজন আর কার্যকর থাকবে না। এক সময় মূল প্রশ্ন ছিল— আরব বনাম ইসরাইল। তারপর প্রশ্ন দাঁড়াতে পারে, সুন্নি বনাম শিয়া।
এখন যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে তা আরো জটিল : ইরানকেন্দ্রিক প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক বনাম সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান নিরাপত্তা কাঠামো। এর পাশে নীরবে পর্যবেক্ষণে থাকবে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামো। থাকবে চীন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। এটি হবে এক ধরনের বহুমেরু মধ্যপ্রাচ্য।
বাংলাদেশের জন্য বিপদ কোথায়
বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অভিঘাত সামরিক নয়, অর্থনৈতিক। প্রথম ধাক্কা আসবে জ্বালানিতে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব— দুই পথেই বিঘ্ন তৈরি হলে অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, জাহাজভাড়া এবং বীমা ব্যয় বাড়বে। আন্তর্জাতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প এবং কৃষির খরচ বাড়াবে।
দ্বিতীয় ধাক্কা আসবে মূল্যস্ফীতিতে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এতে বাড়বে খাদ্য ও পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়। ফলে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় ঝুঁকি শ্রমবাজারে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নিয়োগ, নির্মাণ, পর্যটন, পরিবহন ও সেবা খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
চতুর্থ ঝুঁকি সমুদ্রবাণিজ্যে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের ওপর একই সাথে চাপ তৈরি হলে এশিয়া-ইউরোপ রুটে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরবের গভীর অর্থনৈতিক ও জনসম্পর্ক রয়েছে। আবার ইরানের সাথেও ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীনের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কূটনীতি হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’— জাতীয় স্বার্থের অক্ষ।
শেষ কথা
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পরবর্তী যুদ্ধের কেন্দ্র কোথায় হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সৌদি আরব ইতোমধ্যে যুদ্ধের অভিঘাত নিজের ভূখণ্ডে অনুভব করছে। তবে ইরান ও সৌদি আরব উভয়েই জানে, সরাসরি যুদ্ধের মূল্য ভয়াবহ।
তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো— পূর্ণাঙ্গ ইরান-সৌদি যুদ্ধ নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি ও অবকাঠামোগত যুদ্ধ। কিন্তু প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— কোনো একটি হামলা হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের দরজা খুলে দিতে পারে।
তখন প্রশ্ন হবে— মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কে নির্মাণ করবে? যুক্তরাষ্ট্র? চীন? ইরান? সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান? নাকি শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মধ্যপ্রাচ্য এমন এক বহুমেরু সঙ্ঘাত অঞ্চলে পরিণত হবে, যেখানে কোনো একক শক্তিই আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না?
সম্ভবত দ্বিতীয়টিই বেশি বাস্তবসম্মত।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত