ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কার করা হয়েছে। এতে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবময় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ডাকসুর বিভিন্ন সময়ের কার্যক্রম, আন্দোলন-সংগ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে সেখানে সংরক্ষিত ইতিহাসের প্রদর্শনী ও উপস্থাপনা নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। যৌক্তিক আলোচনা ও একাডেমিক পর্যালোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিতর্ক বা দ্বিমতের সুরাহা হওয়া সম্ভব। কিন্তু একে কেন্দ্র করে ডাকসুতে ঘটে গেছে উদ্বেগজনক ঘটনা। সংগ্রহশালায় রাখা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে তিনি ভিপি পদে প্রার্থী হয়ে আলোচনায় আসেন। নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বয়স্ক প্রার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নির্বাচনে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ১০ জন শিক্ষার্থীর আস্থা অর্জন করেছিলেন আবু তৈয়ব।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের ভাঙচুর অপরাধমূলক কাজ। এটি মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনা নিয়ে নানা মত ও দ্বিমত থাকা স্বাভাবিক। সেটি প্রকাশের পথ কখনোই ভাঙচুর কিংবা নথি ছেঁড়া হতে পারে না। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় রাখা নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ডাকসু নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন তাকে গৌরবান্বিত করার জন্য নয়; ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার যে অবস্থান ছিল, সেই দলিলের অংশ হিসেবেই ক্যাপশনসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। ছবির ক্যাপশনেই সেটি স্পষ্ট করে দেয়া ছিল। এরপরও যদি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপন নিয়ে কারো আপত্তি থাকে, তবে তা স্মারকলিপি প্রদান বা শিক্ষক-ইতিহাসবিদদের মাধ্যমে যৌক্তিক পর্যালোচনার টেবিলে সমাধান করা যেত। ডাকসু নেতাদের সাথে আলোচনায়ও বসা যেত।
আলোচনার পথ খুলে রেখেছিলেন ডাকসু নেতারাই। উদ্বোধনের পরপরই তারা জানিয়েছিলেন, সংগ্রহশালায় কয়েকজন ভিপি-জিএসের ছবি, নথি ও ঐতিহাসিক উপাদানের ঘাটতি থেকে গেছে। এসব ঘাটতি পূরণ, ভুল সংশোধন এবং ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ করতে এক সপ্তাহ সময় নির্ধারণ করে তথ্য, নথি ও পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু এই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ডাকসুর সংগৃহীত সামগ্রী ভাঙচুর করেছেন আবু তৈয়ব। এই আচরণ আদতে মব কালচারেরই নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের পদক্ষেপ এক ধরনের বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে। আজ যদি একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র নষ্ট করতে শুরু করে, তবে কাল অন্য কেউ এসে ভিন্ন কোনো ইতিহাস মুছে ফেলতে বাধ্য করবে।
ইতিহাস রক্ষা ও নির্মোহ মূল্যায়ন কারো খামখেয়ালিপনার ওপর ছেড়ে দেয়া যায় না। ডাকসু সংগ্রহশালার সংগ্রহ নিয়ে যাদের আপত্তি, পরামর্শ বা নতুন কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে চান, তাদেরকে ডাকসুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে লিখিত পরামর্শ ও ঐতিহাসিক উপকরণ জমা দেয়া উচিত বলেই আমরা মনে করি।
বিতর্ক থাকবে; কিন্তু তা নিরসনের পথ হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নিয়মতান্ত্রিক। অপরাধমূলক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালাকে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা বিশ্ববিদ্যালয়কে ফ্যাসিবাদ সময়ের মতো উন্মাদনার আখড়া বানাতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।