জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, লংমার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা গেলে সরকার সবার আগে তার আয়োজন করত। তিনি বর্তমান সঙ্কটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনাকে দায়ী করেছেন। আরো নির্ভুলভাবে বললে, এগুলো সঙ্কট তীব্র হওয়ার দু’টি তাৎক্ষণিক কারণ। একই বক্তব্যে তিনি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের গুরুত্ব স্বীকার করে তাদের সাথে নিয়ে দেশ গঠনের কথাও বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছু সত্য আছে; কিন্তু সেই সত্যের ভিত্তিতে সঙ্কটের পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তথ্যগত ভিত্তি থাকলেও বক্তব্যটি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সমাধান দেয় না। একইভাবে বিরোধী দলকে সহযোগিতার আহ্বান ইতিবাচক। তবে তাদের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে কটাক্ষ করা সেই আহ্বানের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের উত্তর রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ নয়; প্রয়োজন পূর্ণ সত্য, পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এবং বিরোধী দলের বৈধ ভূমিকার প্রতি সম্মান।

যুদ্ধ ও দুর্ঘটনা সঙ্কট তীব্র করেছে— সৃষ্টি করেনি

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দাবি— সরকার গঠনের ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তার এই বক্তব্য সময়রেখার বিচারে সঠিক। নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার পর ওই মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীকেন্দ্রিক সরবরাহ বিঘ্ন তীব্র হয়। কাতার থেকে চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের এলএনজি সঙ্কট

দ্বিতীয় দাবিটিও মূলত সত্য। মহেশখালীর একটি এফএসআরইউতে আগুন লেগে বিদ্যুৎ, নিয়ন্ত্রণ ও বয়লারসংযুক্ত তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি সরবরাহ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে একটি পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট আংশিকভাবে চালু করে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে ‘শর্ট সার্কিটই দুর্ঘটনার কারণ’—এমন সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত নয়।

কিন্তু এই দু’টি ঘটনা বর্তমান সঙ্কটের প্রধান ও পূর্ণ কারণ হিসেবে উপস্থাপন করলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। দুর্ঘটনার আগেই দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি ছিল। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে— বেশির ভাগ খাত মোটামুটি স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক অন্তত তিন হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পূর্ণ ঘাটতি দূর করতে প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ যুদ্ধ ও এফএসআরইউ দুর্ঘটনা না ঘটলেও দেশে গুরুতর গ্যাস-ঘাটতি থাকত।

গ্যাসের চাহিদা, সরবরাহ ও দেশীয় উৎপাদনের হিসাব

ন্যায্যতার সাথে স্বীকার করতে হবে, প্রধানমন্ত্রী তার পূর্ণ বক্তব্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থা, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বোঝা এবং সৌরবিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ফলে তিনি কাঠামোগত সমস্যার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন— এ অভিযোগ তথ্যগতভাবে টিকবে না; কিন্তু কারণ স্বীকার করা এবং অর্থায়ন, দায়িত্ব ও সময়সীমাসহ বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান দেয়া এক বিষয় নয়।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। লক্ষ্যটি ইতিবাচক; কিন্তু প্রতি বছর কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে। জমি ও সঞ্চালনব্যবস্থা কিভাবে নিশ্চিত হবে। কত মেগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি সংরক্ষণক্ষমতা স্থাপিত হবে। অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে। লক্ষ্য পূরণ না হলে কে জবাবদিহি করবেন— এসব এখনো স্পষ্ট নয়। লক্ষ্য ঘোষণা কর্মপরিকল্পনার বিকল্প হতে পারে না।

২০২৯ সালের মধ্যে আরো তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনাও কঠোর অর্থনৈতিক পরীক্ষার দাবি রাখে। টার্মিনাল গ্যাস উৎপাদন করে না; শুধু আমদানিকৃত এলএনজি গ্রহণ করে। এলএনজি কিনতে ডলার, জাহাজ, বীমা এবং নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহ প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতার মধ্যে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে সেগুলো চালানোর মতো এলএনজি কেনা না গেলে অবকাঠামোগুলো অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হবে। দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি দেশকে কয়েক দশকের আমদানি ও ডলার-দায়ের মধ্যে আবদ্ধ করতে পারে। নতুন কোনো এফএসআরইউ অনুমোদনের আগে সংসদে পূর্ণ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি যাচাই উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

সরকারের অবিলম্বে ৯০ দিনের জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ করা উচিত। এতে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন, এলএনজি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রকৃত চাহিদা ও লোডশেডিংয়ের তথ্য থাকতে হবে।

এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দেশীয় মজুদ এবং সর্বোচ্চ মেরামতকাল নির্ধারণ করতে হবে। একই সাথে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ, সিএনজি ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাস বরাদ্দের অগ্রাধিকার প্রকাশ করতে হবে।

মধ্যমেয়াদে এলএনজি আমদানির সর্বোচ্চ বার্ষিক সীমা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ ক্ষমতার সাথে বেঁধে দিতে হবে। সীমাটি তিন বছর মেয়াদি চলমান ভিত্তিতে নির্ধারিত হোক; জরুরি বিচ্যুতির কারণ ও ব্যয় সংসদে প্রকাশ করতে হবে। দেশীয় কূপ খনন ও পুরনো কূপ সংস্কারে কূপভিত্তিক উৎপাদন-লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। অদক্ষ গ্যাসকেন্দ্রের পরিবর্তে দক্ষ সম্মিলিত চক্রের কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ, সিএনজি পরিবহন ও গৃহস্থালি গ্যাসের একটি অংশ পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতায়িত করে মূল্যবান গ্যাস শিল্প, সার উৎপাদন এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। তবে নির্ভরযোগ্য গ্রিড, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও রূপান্তর-সহায়তা নিশ্চিত করে এ বিদ্যুতায়ন করতে হবে।

সৌরবিদ্যুতের সাধে ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা দ্রুত না বাড়ালে শুধু ঘোষিত নবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা মোকাবেলা করা যাবে না।

বিরোধী দল সরকারের অংশ নয়— গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে সাংবিধানিক পার্থক্যটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন— বিরোধী দল সরকারের অংশ নয়। বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্র, সরকারের জবাবদিহি এবং জনগণের স্বার্থরক্ষার অপরিহার্য অংশ। তার দায়িত্ব সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমর্থন করা নয়। ভালো কাজে সহযোগিতা করা। ভুল ধরিয়ে দেয়া। বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা। একই সাথে সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

কোনো বিরোধী দল দাবি করেনি যে, লংমার্চ করলে গ্যাস উৎপাদন হবে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়ে যাবে। লংমার্চ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। এর উদ্দেশ্য জনদুর্ভোগ দৃশ্যমান করা। সরকারের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। দ্রুত সমাধান দাবি করা। সরকার কর্মসূচিতে গাড়ির ব্যবহার, ব্যয়, যানজট কিংবা সম্ভাব্য জনদুর্ভোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে; কিন্তু অন্তর্নিহিত জনদাবির উত্তর না দিয়ে শুধু কর্মসূচিকে কটাক্ষ করা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত সহযোগিতা ও সহাবস্থানের চেতনাকে দুর্বল করে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।’ রাজনীতিতে গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষমূলক ভাষার স্থান থাকা উচিত নয়। সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকারের বৈধ কর্তৃত্বও মানতে হবে; কিন্তু শালীনতার একতরফা সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বিরোধী দলের কঠোর প্রশ্ন, সংসদীয় প্রতিবাদ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সীমিত করার অধিকার সরকারের নেই। বাকশালীনতার নীতি সরকার ও বিরোধী দল— উভয়ের ওপর সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সময়ে জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সহযোগিতা নিঃশর্ত নয়। সরকার যতদিন জনগণের স্বার্থে, জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি রেখে কাজ করবে, তত দিন বিরোধী দল তাকে সহযোগিতা করবে; কিন্তু রাষ্ট্র যদি জনগণের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে পরিচালিত হয়, তাহলে তার বিরোধিতা করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার কোনো বিশেষ দলের ব্যক্তিগত সরকার নয়। একটি দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও সরকারের দায়িত্ব পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতি। বিরোধী দলের সহযোগিতা চাইলে সরকারকেও তাদের প্রশ্ন, সমালোচনা, সংসদীয় তদারকি এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের বৈধ অংশ হিসেবে সম্মান করতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব শুধু সঙ্কটের কারণ ব্যাখ্যা করা নয়; কত দিনের মধ্যে কত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কতটা কমবে এবং কার ওপর বাস্তবায়নের দায় থাকবে— তা স্পষ্ট করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু প্রতিবাদ নয়; তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, কার্যকর বিকল্প এবং জনস্বার্থে সহযোগিতা দেয়া।

সম্প্রীতি মানে নীরবতা নয়, সহযোগিতা মানে আত্মসমর্পণ নয় এবং বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়। রাজনৈতিক কটাক্ষ দিয়ে সঙ্কটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন সত্য স্বীকার, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, প্রকাশ্য জবাবদিহি এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক গণতান্ত্রিক সম্মান।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

rtlbddhaka@yahoo.com