মোহাম্মদ সাদউদ্দিন

ভারত কি তুষের আগুনের মতো জ্বলছে ধিকি ধিকি করে? এই প্রশ্নটাই এখন দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরপাক খাচ্ছে- কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো নীরবে। সর্বত্রই কিন্তু মানুষ প্রশ্ন তুলছে।

গত দুই বছরের মধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালে গণবিক্ষোভ ও গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সরকার উৎখাতের ঘটনা ঘটল, যা নজিরবিহীন। ফ্রান্সে জনবিক্ষোভের জেরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পতন হয়েছে অভিসংশনের মাধ্যমে। একইরকম ক্ষোভের আগুনে কি জ্বলছে এখন ভারত? সারা ভারতে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার নেমে আসায় মানুষ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। ত্রিপুরায় মানুষ রাস্তায় নেমে ঘোষণা করেছে এ রাজ্যে বাঙালি ছাড়া কেউ থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গে এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন চলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মনিপুর বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে আদিবাসী জাতিদাঙ্গায় বিধ্বস্ত যা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেরেছে। বিহারে সেনা-বিদ্রোহ, আসামে আদিবাসীরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে রাস্তায়, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে মানুষ; এই রাজ্যে আর জি কর হাসপাতালে ডাক্তার ছাত্রীর অকালে প্রাণ চলে যাওয়া, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থ্রেট কালচার, নদীয়ার পলাশীতে তামান্না খাতুনের মতো এক মেধাবী শিশু ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনা মানুষকে আন্দোলনমুখী করে তুলেছে। মোদি সরকারের সর্বনাশা ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে আন্দোলন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আসামের তিনসুকিয়াতে আদিবাসী বিদ্রোহ। বিহারে ছাত্র বিদ্রোহ ও সেনা বিদ্রোহ। তার উপর গোটা ভারতের মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে এনআরসি ও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। একটিতে নাগরিকত্ব হরণ, অন্যটিতে ভোটাধিকার হরণ। তার উপর কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সদর্প ঘোষণা ডিটেনশন ক্যাম্প মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এ নিয়ে রাহুল গান্ধীর ভোটাধিকার যাত্রা দারুণভাবে সফল। পাটনার গান্ধী ময়দানের সমাবেশ কার্যত জনসমুদ্র। রাহুলের আরো একটি ভারত যাত্রার অপেক্ষায় মানুষ। চারিদিকে বিদ্রোহের মশাল জ্বলছে। এর কারণ শুধু পুঁজিপতিদের তেলা মাথায় তেল দেয়া? সাধারণ মানুষের কথা না ভাবা?

নেতাদের অট্টালিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, টাকার পাহাড় জমছে; আর সাধারণ মানুষের জীবন নির্বাহ করতে নাভিশ্বাস উঠেছে। দীর্ঘদিন কর্মসংস্থান নেই, বেকার হয়ে বসে রয়েছে ইয়ং জেনারেশন, বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে, অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে ঠেকেছে, মানুষের হাতে টাকার টান, পেটে খিদের জ্বালা, চিকিৎসা ও পড়াশোনা টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া, ঋণের বোঝায় জর্জরিত কৃষকসমাজ, যাদের ঋণ মওকুফ হয় না তাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়। অন্যদিকে আদানি আম্বানির কোটি কোটি টাকার ঋণ মওকুফ। মানুষ আর কত সহ্য করবে! আর কত! বিপ্লব কি অবশ্যম্ভাবী? এই ক্ষোভের আগুনে কি ভারতে পটপরিবর্তন বা সরকার উৎখাত হবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো তো রয়েছে যা অনেক পুরনো। সেই গণতান্ত্রিক কাঠামোতে রয়েছে একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের নির্দিষ্ট ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া আছে। রয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্যের সহাবস্থান। সেখানে ভারতের মতো দেশে গণ-বিদ্রোহের মাধ্যমে কোনো নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটানো খুবই দুরূহ। একমাত্র নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমেই সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে সংবিধানের ৩৫৫ ও ৩৫৬ ধারা যেখানে কোনো রাজ্য সরকারকে সাময়িকভাবে উৎখাত করা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতেই হবে। অথবা রাজ্যপালকে দিয়ে আস্থা-অনাস্থা ভোট করেও সরকার নির্ণয় করা যায়। কেন্দ্রেরক্ষেত্রেও তাই। তবে নির্বাচনে যেতেই হবে। যে যতই রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ করুন না কেন, ভোটের মাধ্যমেই সরকার নির্ধারণ করতে হবে। গণবিদ্রোহ, বৃহত্তর পরিসরে লড়াই আন্দোলন বা গণবিক্ষোভে কোনো নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের সুযোগ কম। কিন্তু এই ক্ষোভের আঁচ পড়ে ভোটে। যেমন ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা জারির পর গোটা দেশের মানুষ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর ভরাডুবি হয়েছিল। আবার সেই ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮০ সালে নির্বাচনেই ওভারকাম করেন। যদিও তার পেছনে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সহযোগিতা।

রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্কে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে তৎকালীন জনতা সরকারের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং একচুল সরেননি বলে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু কংগ্রেস সমর্থন দিলে জনতা দলের আরেক তরুণ তুর্কি চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হন। তবুও সেই সরকার স্থায়ী হয়নি। কংগ্রেস সমর্থন তুলে নেয়। শেষে ওইরকম পরিস্থিতিতে ১৯৯১ সালের লোকসভার অন্তর্বর্তী নির্বাচন হলে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। পিভি নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯২ সালে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মদদে উন্মত্ত করসেবকরা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। যেহেতু কেন্দ্রে কংগ্রেস, তাই মুসলিমদের কোপটা পড়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাই আবার মুসলিম ভোট কংগ্রেসের বিরুদ্ধে চলে যায়। আদিবাসী জনজাতি গোষ্ঠীও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে চলে যায়।

এখন ভারতে যে সরকার ক্ষমতায়, সেই সরকারের প্রতিটি নীতি ভারতের প্রান্তিক মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেছে। ২০১৬ সালের নোটবন্দী ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। কালো টাকা তো বাইরে থেকে ফিরে আসেইনি; বরং কালো টাকা যাদের হাতে রয়েছে সেই সব করপোরেট হাউজগুলো ব্যাংক ডাকাতি করে আজ নিরাপদে বিদেশে বাস করছে। গুডস সার্ভিস ট্যাক্স বা জিএসটির অনেক ক্ষেত্রে এখন ছাড় দিলেও এই জিএসটি ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা। মোদি সরকারের কৃষি আইন পুরো করপোরেট স্বার্থবাহী। এর বিরুদ্ধেও ভারতের কৃষক-ক্ষেতমজুর-শ্রমিকরা আন্দোলন করে। তারা করোনাকালেই দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় রাজধানী দিল্লি শহর অবরুদ্ধ ও অচল করে রাখে। ফলে মোদি সরকার কৃষি আইন বদলাতে বাধ্য হয়। কিন্তু এখনো কৃষকরা কৃষিদ্রব্যের সহায়ক মূল্য পাচ্ছেন না। তার উপর বিজেপি-আরএসএসের করপোরেট সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজন, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি খতমের প্রবণতা, এক দেশ এক ধর্ম, এক দেশ এক ভাষা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, করপোরেট-সহযোগী প্রবণতা ভারতের প্রান্তিক মানুষের মনে তুষের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে চারিদিকে জমে ওঠা ক্ষোভ ভোটবাক্সেই প্রতিফলিত হবে। সময়ই সে কথা বলে দেবে। কেন না, মানুষই শেষ কথা বলে। গুজরাট গণহত্যার সমুচিত শিক্ষা ভারতের বিজেপি দল পেয়েছে ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। রাহুলের ২০২৪-এর ভারতযাত্রা মোদি সরকারের ৪০০ আসনের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। ক্ষোভ কিন্তু ভোটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ক্ষোভ ও বিদ্রোহ আরো বাড়ছে।

লেখক : কলকাতার একজন কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি