২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোয় একটি অভূতপূর্ব বহুকেন্দ্রিক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছিল। নাগরিক সমাজ, সংস্কার কমিশন, ছাত্র নেতৃত্ব, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার- সবাই কোনো না কোনো মাত্রায় ক্ষমতার অংশীদার হয়ে উঠেছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাস পর বাংলাদেশের ক্ষমতার মানচিত্র আবারো নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের দিকে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছে।
তবে এটি ২০০১ বা ২০০৮ সালের মতো এককেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোয় সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এটি একটি ‘নিয়ন্ত্রিত বহুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা’র দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ বহন করছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর স্থানান্তর : উপদেষ্টা-রাষ্ট্র থেকে রাজনৈতিক-রাষ্ট্র
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিক সমাজ, সংস্কার কমিশন এবং ছাত্র নেতৃত্বের যে নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল, নির্বাচনের পর তার বড় অংশ নির্বাচিত সরকারের হাতে ফিরে গেছে।
এ সময়ের প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে, নীতিনির্ধারণে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিসভা ও দলীয় হাইকমান্ড পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া আবারো আমলাতন্ত্র ও দলীয় রাজনীতির সমন্বয়ে পরিচালিত হতে শুরু করেছে।
২০২৪-২৫ সালের ‘আন্দোলনভিত্তিক বৈধতা’ ধীরে ধীরে ‘নির্বাচনী বৈধতা’র কাছে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শিক বৈপ্লবিক এজেন্ডার পরিবর্তে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশাসনে দ্বিতীয় দফা পুনর্বিন্যাস : আমলাতন্ত্রের নতুন ভারসাম্য
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক ক্ষমতার ভারসাম্য বিএনপি সরকার নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করছে। এর মধ্যে প্রধান পরিবর্তন হলো- গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব পর্যায়ে পুনর্নিয়োগ ও রদবদল। জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ে ব্যাপক পুনর্বিন্যাস। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রভাবশালী কিছু কর্মকর্তার প্রশাসনিক প্রভাব কমেছে। রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও অভিজ্ঞ আমলাদের পুনরুত্থান ঘটছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রশাসন কখনোই কেবল বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি নিজেই ক্ষমতার একটি স্তম্ভ। বর্তমান পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্য হচ্ছে প্রশাসনিক আনুগত্য, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা।
নিরাপত্তা খাতে বেসামরিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি সেই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে।
নতুন বাস্তবতায় যৌথবাহিনীর অভিযানের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সাথে পুলিশ বাহিনীর সাংগঠনিক পুনর্গঠন, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং জন-আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে তদারকি ও সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। নিরাপত্তা খাতের নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে আবারো নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে কেন্দ্রীভূত হওয়ার লক্ষণ বহন করছে।
এটি মূলত ‘নিরাপত্তা-নেতৃত্বাধীন শাসন’ থেকে ‘নাগরিক-নেতৃত্বাধীন শাসন’ ব্যবস্থায় উত্তরণের একটি ধাপ। তবে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব পুরোপুরি কমে যায়নি; বরং তারা এখনো বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে বেসামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার নতুন ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে।
অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস : নতুন এলিট জোটের উত্থান
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোরও নতুন পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক শিল্প, ব্যাংকিং খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে নতুন ব্যবসায়িক জোট ও অংশীদারত্বের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্য, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগভিত্তিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে সামনে আনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার, সার্বভৌম তহবিল এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদের সাথে সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাও বেড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো এখন নতুন ধরনের এক ‘রাষ্ট্রব্যবসায়ী জোট’-এ রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দেশীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন সমঝোতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন কৌশলের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব : পররাষ্ট্রনীতি এখন ক্ষমতার অংশ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরপ্রক্রিয়ার সক্রিয় পর্যবেক্ষক ও প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল। গণতান্ত্রিক সংস্কার, নির্বাচন আয়োজন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশ, আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের প্রত্যক্ষ আগ্রহ ছিল। তবে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ভূমিকার ধরনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। এখন রাজনৈতিক রূপান্তরের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মত বিষয় অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমানে চীনের সাথে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং সংযোগ প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সাথে গণতান্ত্রিক সংস্কার, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আবারো একটি ‘ব্যালান্সিং স্টেট’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যেখানে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই প্রধান কৌশল। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি ক্রমশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন

দ্রষ্টব্য : এই শতাংশগুলো পরিমাপযোগ্য পরিসংখ্যান নয়; বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার আপেক্ষিক ভারসাম্যের বিশ্লেষণধর্মী সূচক।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী?
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘বিপ্লব-পরবর্তী বহুকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো’ থেকে ‘নির্বাচিত সরকারকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোয়’ প্রত্যাবর্তনকে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রক্ষমতা বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে বণ্টিত ছিল। নাগরিক সমাজ, ছাত্র নেতৃত্ব, সংস্কার কমিশন, প্রশাসন, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা নীতিনির্ধারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মন্ত্রিসভা আবারো রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে এই প্রত্যাবর্তন অতীতের মতো এককেন্দ্রিক নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে কয়েকটি স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে। প্রথমত, নাগরিক সমাজ ও জনমতের রাজনৈতিক প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো অধিক স্বায়ত্তশাসিত ও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। তৃতীয়ত, নির্বাচিত সরকার এখন জন-জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কঠোর বাস্তবতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের নতুন ক্ষমতা কাঠামোকে এককেন্দ্রিক নয়, বরং নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বাধীন কিন্তু বহুমাত্রিক প্রভাব ও অংশীদারত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত