ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ‘নৌ অবরোধ’ বসিয়েছে। তারা কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সঙ্কটের শঙ্কা তৈরি করেছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সৌদি আরব ১৩টি দেশ নিয়ে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। জোটে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান রয়েছে। এ জোট নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ কতটুকু নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে পারবে, বলার সময় আসেনি।

হুথিরা বলেছে, এই নৌপথ ব্যবহার করে সৌদি আরবের বন্দরে যাতায়াত করা যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হবে। এ হুমকির পর লোহিত সাগরে চলাচলকারী বেশ কিছু তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং সৌদি আরবের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আপাতত বাব আল-মান্দেব প্রণালী এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

বাব আল-মান্দেবের বৈশ্বিক গুরুত্ব
বাব আল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার, যা সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্ত করেছে। প্রণালীটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি সাধারণ জলপথ নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। এর সামান্যতম অচলাবস্থাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ১০ শতাংশ এই সঙ্কীর্ণ প্রণালী দিয়ে যায়। দু’টি প্রণালী একসাথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ- মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রফতানির প্রধান দু’টি ধমনী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়া। এর ফলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় তিন কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করবে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালী আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশকে পৃথক করেছে এবং লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর তথা ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এর এক পাশে রয়েছে ইয়েমেন (এশিয়া) এবং অন্য পাশে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া (আফ্রিকা)। প্রণালীটি মাত্র ৩২ কিলোমিটার চওড়া। এর মধ্যে ‘প্যারিম দ্বীপ’ থাকায় জাহাজ চলাচলের মূল চ্যানেলটি আরো সঙ্কুচিত হয়ে মাত্র ৩.২ কিলোমিটার চওড়া দু’টি লেনে পরিণত হয়েছে। এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণেই এটি সামরিক ও অর্থনৈতিক ‘চোকপয়েন্ট’।

সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজকে বাব আল-মান্দেব পার হতে হয়। এ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে এশিয়া থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকার পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিকল্প হিসেবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে (কেপ অব গুড হোপ রুট) যেতে হলে প্রতি যাত্রায় অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৪ দিন সময় এবং জাহাজের জ্বালানি খরচ বাবদ ট্রিপ প্রতি প্রায় ১০ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক ভোক্তা পর্যায়ে।

মধ্যপ্রাচ্যের, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদিত তেল ও গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে ইউরোপে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে এই রুট বন্ধ হলে ইউরোপে তীব্র শীতের সময়ে জ্বালানির নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে।

ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
প্রণালীটির অপর পাড়ে অবস্থিত ছোট দেশ জিবুতিতে বিশ্বের প্রধান প্রধান সামরিক শক্তি, যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স ও জাপান তাদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। উদ্দেশ্য এই প্রণালীর নিরাপত্তা এবং নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা। বাব আল-মান্দেব প্রণালী বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং সেখানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের শক্তিশালী অবস্থান এই প্রণালীকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। হুথিরা যখনই লোহিত সাগরে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তখনই পুরো বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থা থমকে দাঁড়ায়। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং ১২ শতাংশ লোহিত সাগরের ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালী’ দিয়ে পরিবাহিত হয়। দু’টি প্রধান নৌপথই এখন কার্যত অবরুদ্ধ। ফলে তেলের বাজারে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তার তেল রফতানি সচল রাখতে বিকল্প পথ ব্যবহার করছিল। তার পূর্ব উপকূল থেকে এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ ব্যবহার করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে আসছিল। বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ এই বিকল্প পথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ রেখে ইয়ানবু বন্দর বা লোহিত সাগরের জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তবে সৌদি আরবের এই শেষ বিকল্প রুটও বন্ধ হয়ে যাবে। সৌদি আরব তেল রফতানিতে কার্যত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

স্থলপথের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন পাইপলাইন যেমন সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহারের কথা বলা হলেও তার বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো পাইপলাইনই সমুদ্রপথের বিপুল তেল একসাথে বহনে সক্ষম নয়। হরমুজের দৈনিক দুই কোটি ব্যারেল তেলের বিপরীতে সৌদি পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা মাত্র ৫০ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল। পাইপলাইন দিয়ে তেল লোহিত সাগরের উপকূলে আনলেও, বাব আল-মান্দেব বন্ধ থাকায় লোহিত সাগর থেকে তা জাহাজে করে বিশ্ববাজারে নেয়া যাবে না। ফলে পাইপলাইন ব্যবস্থার কার্যকারিতাও মুখ থুবড়ে পড়বে।

আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে যে নৌপথ সেটি ঐতিহাসিকভাবে উত্তাল সমুদ্র ও বৈরী আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। এটিকে একসময় ‘ঝড়ের অন্তরীপ’ বলা হতো। তেলবাহী ট্যাঙ্কারের জন্য এই উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়াও দীর্ঘ ও নির্জন এই রুটে জলদস্যুতার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যার জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প পথগুলো সাময়িকভাবে তেল সচল রাখতে পারলেও তা হবে অত্যন্ত ধীরগতির, আকাশচুম্বী ব্যয়ের এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

হুথিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের আইআরজিসি প্রতিনিধিরাই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর অর্থ, হুথিরা স্বাধীন স্থানীয় গোষ্ঠী নয়; বরং কৌশলগত সিদ্ধান্তে তারা সরাসরি তেহরানের কমান্ড কাঠামোর অংশ। গত চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান হামলা বিনিময় হয়েছে। এর অর্থ, রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

যুদ্ধের কারণে মে মাসের পর এই প্রথম বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যরেল-প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত জুন মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে ইরানের আধিপত্য বিস্তার ও হুথিদের জাহাজ অবরোধের চেষ্টায় সেই চুক্তি ভেঙে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল-প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল জানিয়েছেন, এই সঙ্কটের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ১.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল-প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার বেশির ভাগ আমদানির মাধ্যমে মেটায়, তাই বিশ্ববাজারের যেকোনো বড় ধাক্কা সরাসরি দেশীয় অর্থনীতিতে আঘাত করে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫১.০৫ শতাংশ গ্যাসনির্ভর, ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল ২৮.১৫ শতাংশ।

ডলার সঙ্কটের কারণে এখনই অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ করা কঠিন হচ্ছে। বিশ্ববাজারে দাম আরো বাড়লে তেল ও এলএনজি আমদানি হ্রাস করতে হবে, যার ফলে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হতে পারে এবং দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ ডলার পার হলে দেশের বাজারেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়াতে বাধ্য হবে সরকার। ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক ও নৌযানের ভাড়া অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষকরা বোরো ও অন্যান্য মৌসুমে ধান চাষের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজেল-চালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভর করেন। তেলের দাম বাড়লে এবং বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলে চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাবে, যা খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এমনিতেই চাপে রয়েছে। জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরো তীব্র হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মার্কিন-ইরান সঙ্ঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালী একসাথে বন্ধ হলে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সঙ্কটের সৃষ্টি হবে, যা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামুদ্রিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

drkhalid09@gmail.com