বাংলাদেশ থেকে ফ্যাসিবাদ দূর করা কঠিন হবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের চেয়ে এ লড়াই কোনো অংশে কম নয়; বরং এটি হবে দীর্ঘ গভীর এক সংগ্রাম যা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হতে পারে কি-না তা নিয়ে আশঙ্কাও রয়েছে। গত দেড় দশকের সরকারি প্রশাসনে পরিকল্পিত ফ্যাসিবাদ বেড়ে উঠেছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গজিয়ে বসে আছে। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যে বলেছেন, কোথাও পরিবর্তন নেই। দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষের পুরনো বৃত্তের মধ্যে প্রশাসন আটকে আছে। ফ্যাসিবাদমুক্তির জন্য তার চেয়েও বড় বাধা মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন। এ অঙ্গনের রথী-মহারথীরা স্বীকারই করেন না, হাসিনা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন।

হাসিনার দীর্ঘ নির্মম শাসনের প্রধান চরিত্র ছিল বেপরোয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন। সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল গুমের সংস্কৃতি। বাংলাদেশের মিডিয়া ও সাংবাদিকদের বড় অংশ তা মেনে নিতেও প্রস্তুত নয়। সে কারণে তোলপাড় সৃষ্টি করা বীভৎস আয়নাঘরকে মিডিয়া বলছে ‘কথিত’। অথচ দেশে-বিদেশে বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে যে, ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করতে গুমকে হাসিনা মোক্ষম টুল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে ছয় হাজার গুমের ঘটনা ঘটেছে। গুমের শিকার এক হাজার ৫৬৯ জনকে গুম কমিশন চিহ্নিত করেছে। কমিশন নিশ্চিত করেছে, গুমের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ২৮৭ জন। এখনো খোঁজ নেই আড়াই শতাধিক মানুষের। গুম নিয়ে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন হাসিনার শাসনে ক্রমাগত অভিযোগ দিয়ে গেছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ সফর করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। দেশী-বিদেশী সব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে উচ্চহারে গুম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অসংখ্যবার বিবৃতি দিয়েছে।

গুম কমিশনের তদন্তে খোলাসা হয়ে গেছে, হাসিনা দেশে বহু গুপ্ত কারাগার তৈরি করেন। এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের অনেকে শনাক্ত হয়েছেন। গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা অনেক জায়গা চিহ্নিত করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘর পরিদর্শন করেছেন। গুম কমিশন মোট ৪০টি গুপ্ত কারাগার পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় আটটি। র‌্যাব পরিচালিত এ ধরনের একটি গুপ্ত কারাগার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, প্রসিকিউটর ও মানবাধিকারকর্মীরা পরিদর্শন করেন। এই খবর দিতে গিয়ে দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকা আয়নাঘরের আগে ‘কথিত’ তকমা দিয়ে দেয়।

হাসিনার আমলে বাহিনীগুলো এর নাম দিয়েছিল আয়নাঘর। অন্ততপক্ষে ঢাকায় ডিজিএফআই ও র‌্যাব পরিচালিত বন্দিশালাগুলোর এ নাম ছিল। এটি ছিল তাদের কোড নেম। বিষয়টি ২০২২ সালে জানাজানি হয়। ওই বছর ১৬ আগস্ট তাসনিম খলিল নেত্র নিউজে এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি প্রথম তথ্য-প্রমাণ হাজির করেন আয়নাঘরের। এগুলো ছিল বিরোধীদের নির্যাতন করার গুপ্ত বন্দিশালা। প্রকাশ হওয়া চিত্রে সেখানে আটক বন্দীদের বীভৎস নির্যাতনের বিবরণ পাওয়া যায়। তিন ফুট বাই চার ফুট এবং চার ফুট বা তারও কম উচ্চতার ছোট ছোট সেলে তাদের বন্দী রাখা হতো। দাঁড়ানো বা বসার সুযোগ ছিল না। স্বভাবিক নড়চড়াও ছিল কষ্টকর। ওই ছোট্ট কুঠুরির মধ্যেই ছিল প্রস্রাব পায়খানার ব্যবস্থা। ছিল না কোনো ভেন্টিলেশন। এমন কুঠুরিতে মাসের পর মাস কাটাতে হয়েছে তাদের। ঢাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান এমন একটি সেলে আট বছর কাটিয়েছেন। এর সাথে ছিল টর্চার চেম্বার। সেখানে যত ধরনের নিষ্ঠুরতা ছিল নির্যাতনের জন্য, তার সব চালানো হতো। এই বিষয়গুলোর সাক্ষী এখন পুরো জাতি। কিন্তু পত্রিকায় লেখা হলো ‘কথিত’। পরে ‘কথিত’ শব্দটি প্রত্যাহার করে নেয়া হলেও এটি আসলে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের কঠিন সংগ্রামের কথাই স্মরণ করিয়ে দিলো। হাসিনার তৈরি ফ্যাসিবাদ যে গভীরে প্রবেশ করেছে, তা উপড়ে ফেলা এক দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য কাজ। কারণ, যারা এ কাজটি করবেন তারাই ফ্যাসিবাদের পক্ষের শক্তি। বাংলাদেশের মিডিয়া মোটাদাগে হাসিনার সহযোগী ছিল। শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকরা অভ্যুত্থানের দু’দিন আগেও হাসিনার প্রতি কেবল সমর্থন ব্যক্ত করেননি, রাস্তায় আন্দোলনকারীদের হত্যার উসকানিও দিয়েছেন। ওই বৈঠকের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে এখনো আছে। এই সাংবাদিকরা হাসিনার মায়া ত্যাগ করতে পারবে না, তার আলামত স্পষ্ট।

হাসিনার শাসনের শুরুতেই বোঝা গেছে তিনি গুমের কৌশল নিয়েছেন। তিনি প্রথম নিশানা করেছিলেন দেশপ্রেমিক সাহসী বিরোধী নেতাদের। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী ও ঢাকার কমিশনার চৌধুরী আলম তার প্রথম শিকার। ইলিয়াস আলীকে যখন শেষ করে দেয়া হয় তখন হাসিনা ইলিয়াসের স্ত্রী-সন্তানকে গণভবনে ডেনে নেন। তাদের সামনে ইলিয়াস আলীর মৃত্যু নিয়ে শোকের অভিনয় করেন। মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে, ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তে এখন বিষয়টি প্রমাণিত যে, হাসিনা ইলিয়াস আলীর মৃত্যু নিয়ে তার পরিবারের সাথে নিষ্ঠুর নাটক করেছেন। আরো বহু মানুষকে হত্যার পর হাসিনা একই নাটক করেছেন। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গুমের ঘটনায় আজকে যে পত্রিকা ‘কথিত’ বলছে, সেটি তখন হাসিনা সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। কয়েক হাজার গুম হওয়ার পরও তারা একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেনি। কখনো এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। অথচ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে জঙ্গিবাদ নিয়ে শত শত রিপোর্ট করেছে। প্রায় সবগুলো ছিল সাজানো। এখন যার হাতেনাতে প্রমাণ মিলছে। সরকারের পক্ষ হয়ে তারা এই রিপোর্ট করেছে।

পত্রিকাটির এ ধরনের একটি ডাহা মিথ্যা রিপোর্ট সম্প্রতি প্রমাণ হয়েছে। মেধাবী চৌকশ সেনাকর্মকর্তা মেজর জাহিদকে ২০১৬ সালে এক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে। তখন জাহিদকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। বর্তমান সরকার বিষয়টি তদন্ত করে জঙ্গিবাদের সাথে জাহিদের জড়িত থাকার প্রমাণ পায়নি। প্রকৃতপক্ষে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের কিছু স্পর্শকাতর বিষয় জেনে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয়। বর্তমান সরকার তাকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার পদোন্নতি দিয়েছে। তার উপযুক্ত মূল্যায়ন করা করেছে।

ওই সময় তার বিরুদ্ধে পত্রিকাটির জঙ্গিবিষয়ক প্রতিবেদনের জের ছিল ভয়াবহ। সেটি তার বিধবা স্ত্রী এবং সন্তানদের ওপর দিয়ে গেছে। সদ্যোজাত কন্যাশিশুসহ স্ত্রীকে জঙ্গি কলঙ্ক নিয়ে জেল খাটতে হয়েছে। এর পর আরেক কন্যাসহ তাকে আয়নাঘরেও বন্দী রাখা হয়েছিল। ২০১৬ সালের পর সরকারি বাহিনীর নির্যাতনে পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। মা-বাবা, শ্বশুরের পরিবারে নেমে এসেছে লাঞ্ছনা অপমান ও বিপর্যয়। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তকমা পত্রিকা সূত্রে লেগে গিয়েছিল। সবাই এটি জেনে গিয়েছিল। পত্রিকায় এ ধরনের রিপোর্ট না হলে অত্যাচারের এই নির্মম স্টিমরোলার চালানোর সুযোগ ফ্যাসিবাদী সরকারের ছিল না। জাহিদকে মরণোত্তর পদোন্নতি দেয়ার পরও পত্রিকাটি ওই রিপোর্টের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে পত্রিকাটি একই ধরনের বহু ভিত্তিহীন রিপোর্ট করেছে। এছাড়া জঙ্গি-সংক্রান্ত বায়বীয় রিপোর্ট রয়েছে শত শত। কথিত ‘সুশীল’ পত্রিকায় রিপোর্ট হওয়ায় বহু মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ দুর্দিন। এসব রিপোর্টের বেশির ভাগ ছিল বাইলাইন। কারণ স্টার জার্নালিস্ট তকমা, পদোন্নতি নানা সুবিধাদি হাতানোর জন্য যেন এই রিপোর্ট করে। এ ধরনের ভুয়া রিপোর্টের জন্য কোনো সাংবাদিককে আজ পর্যন্ত ন্যূনতম জবাবদিহি করতে হয়নি।

গুম-খুন ছাড়াও হাসিনা সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অসংখ্য গুরুতর অপরাধ করেছে। এর মধ্যে ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া, ভোটাধিকার হরণ, ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা ম্যাসাকার, দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেয়া। এত সব অপরাধে জড়িতদের বিচার হয়নি। এ নিয়ে মিডিয়ার হাহাকার দূরে থাক, সামান্য দায়িত্বশীলতা দেখা যায় না। এরই মধ্যে জুলাইকে জঘন্যভাবে গালিগালাজ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, জুলাই সন্ত্রাস, জুলাই বিশৃঙ্খলা। টিভি টকশোতে বসে জুলাই সংশ্লিষ্টদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। হাসিনা সরকারের প্রতি সম্মতি উৎপাদনের কাজ করতে তারা সামান্য কুণ্ঠাবোধ করছে না। এজন্য তাদের কোনো পরিণতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। রাস্তায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়েছে। ৩০ হাজার মানুষের গুরুতর অসুস্থ ও অঙ্গহানি হয়েছে। এসবের বিচার এখনো বহু দূরে। আদৌ বিচার হবে কি-না, গভীর সন্দেহ রয়েছে।

মিডিয়া ফ্যাসিবাদের অপরাধকে খাটো করে দেখানোর কাজে নেমে যেতে পারছে তাদের অপকর্মের জবাবদিহি না থাকায়। পত্রিকার একটি রিপোর্টের কারণে যে পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল, তার প্রতিকার কিভাবে মিলবে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রেস ফ্রিডম কি মিডিয়াকে এভাবে একটি পরিবার শেষ করে দেয়ার অধিকার দিয়েছে? একটি পরিবারের প্রধান পিতাকে হত্যা করে ফেলার পরও এ ধরনের অধিকারের আড়ালে তথাকথিত সাংবাদিকরা রক্ষা পেয়ে যাবে? এই দেশের সাংবাদিকদের অন্যায় করার স্বাধীনতা বটে! এ কারণে জুলাই কথিত হয়ে যেতে খুব বেশি দিন আর লাগবে না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

jjshim146@yahoo.com