বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত। সর্বশেষ গত চার আগস্ট-২০২৬, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষ সেটিই আবার আমাদের মনে করিয়ে দিলো।

যখন ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দু’বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে এই বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দেখতে পাওয়ার কথা, সে সময় এই সঙ্ঘাতের ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সঙ্কেত ছাড়া কিছু নয়। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে; কিন্তু তা না করে একে-অন্যকে উৎখাত করার অভিপ্রায় থেকে শক্তি প্রয়োগের ঘটনা কিছুতেই গণতান্ত্রিক অধিকার হতে পারে না।

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো, আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা ও সঙ্কট মোকাবেলা করা। আলোচনার পথ পরিহার করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পন্থা নিঃসন্দেহে অগণতান্ত্রিক। তবে কোনো পক্ষ যদি যুক্তি ও আলোচনার বদলে বেপরোয়া অবস্থান নিয়ে পেশিশক্তিকে সমাধানের পথ হিসেবে দেখে, তখন সেটি ভিন্ন কথা। তারপরও সংলাপের মাধ্যমে ওই ধরনের পরিস্থিতিও মোকাবেলা করার অনেক দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আছে। এমনকি যে দেশে গণতন্ত্রের ‘গ’ ছিল না, সে দেশে যখন শক্তি প্রয়োগ না করে সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজিত জনগণকে শান্ত করার ঘটনা ঘটে তখন আমাদের দেশে গণতন্ত্রকামী নেতাদের লজ্জা পাওয়ারই কথা। সে রকম একটি দেশের নাম কমিউনিস্ট চীন এবং সেই ঐতিহাসিক ঘটনার নায়ক ছিলেন চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই। সেটি ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কাল, যা ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চলেছিল।

সে ঘটনা উল্লেখ করার আগে, চৌ এন লাই সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। কারণ তিনি সেই সময়কালে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান, ধৈর্যশীল, মার্জিত আচরণ ও বাকপটু নেতা হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। সঙ্কটকালে কিভাবে ধৈর্য ধারণ করে সংলাপ ও কৌশলের মাধ্যমে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি শান্ত করা যায়, সে দৃষ্টান্ত তিনি অনেকবার রেখেছেন।

একটি ঘটনা ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। সেটি ছিল চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ের ঘটনা। যখন সাংস্কৃতিক বিপ্লব চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, তখন একদল উগ্র ‘গ্রেট গার্ড’ তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘চেন ই’কে ‘আক্রমণ ও বন্দী’ করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে। তারা ছিল চরম উত্তেজিত, সশস্ত্র এবং যেকোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করতে প্রস্তুত।

এ রকম এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি কোনো সামরিকবাহিনী কিংবা পুলিশি শক্তি ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ একা সেই উত্তেজিত ও ক্রুদ্ধ জনতার মুখোমুখি হন।

কোনো ধমক বা বল প্রয়োগ না করে তিনি শান্তভাবে তাদের সামনে দাঁড়ান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তিনি উত্তেজিত তরুণদের সব দাবি ও স্লোগান মনোযোগ দিয়ে শোনেন। যখন তাদের চিৎকার, চেঁচামেচি কিছুটা কমে আসে, তখন চৌ এন লাই অত্যন্ত মার্জিত ও জোরালো ভাষায় তাদের বোঝাতে শুরু করেন। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আক্রমণ করলে বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ধ্বংস করলে, তা বিদেশী শত্রুদের সুবিধা দেবে এবং চীনের ভাবমর্যাদা সারা বিশ্বে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন্ন হবে। তার এই অসামান্য বাকপটুতা, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের যুক্তি শুনে উত্তেজিত তরুণরা শান্ত হয়ে যায়। তারা কোনো সহিংস ঘটনা না ঘটিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে চৌ এন লাই প্রমাণ করেছিলেন, অস্ত্রের চেয়ে সংলাপ ও ধৈর্যের শক্তি অনেক বেশি কার্যকর।

আমি এই উদাহরণ এ কারণে এখানে উল্লেখ করছি যে, যেখানে অগণতান্ত্রিক ও একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন বিরাজ করছে, সে রকম একটি দেশে যখন শক্তি প্রয়োগ না করে সংলাপ ও ধৈর্যের মাধ্যমে উত্তেজিত জনগণকে শান্ত করার দৃষ্টান্ত আছে, সেখানে আমাদের মতো গণতন্ত্রকামী একটু দেশে সংলাপের পরিবর্তে সঙ্ঘাতের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আর ঠিক যখন ফ্যাসিবাদ-উত্তর একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত তখন এ ধরনের সংঘর্ষ কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়; বরং হতাশার বার্তাই বহন করছে। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো সহনশীলতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা; কিন্তু সে পথে না হেঁটে যখন বল প্রয়োগের পন্থা অবলম্বন করা হয়, তখন গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। তখন ফ্যাসিবাদের ছায়া জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে। এ ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলের দায়িত্ব একই রকম। তবে সরকারি দলের দায়িত্ব আরো বেশি।

কারণ সরকারি দল বিএনপি এমন একটি দল, যে দলটিকে সবসময় অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরশাসন থেকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রত্যাবর্তনের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সুতরাং সে দলকে অবশ্যই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তা না হলে দেশ আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে কিংবা আবার কোনো অগণতান্ত্রিক পথে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে আগেভাগেই সতর্ক থাকা উচিত বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক