কৃষি ও শিল্পের বহুমুখীকরণ বেকারত্ব নিরসন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং কুটির শিল্প ও এসএমই খাতের সম্প্রসারণে দেশে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, যা শিক্ষিত তরুণদেরও উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেকার (সূত্র : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ দশমিক ৭ কোটি। এই বিশাল জনসংখ্যায় দিন দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে যা বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। এ দেশের উন্নয়নে এ বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা অতীব জরুরি।
বেকারত্ব দূরীকরণে কৃষি ও শিল্পের বহুমুখীকরণের কৌশলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :
১. কৃষি খাতের বহুমুখীকরণ ও আধুনিকায়ন :
ক. উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন : ধান ও গমের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, মসলা এবং রফতানিমুখী ফল (যেমন- ড্রাগন, স্ট্রবেরি) চাষের মাধ্যমে আয় বহুগুণ বাড়ানো যায়। উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চফলনশীল বীজ কৃষি উৎপাদনকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে। দেশের শিক্ষিত তরুণরা যদি কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নেয় তাহলে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ গ্রামে ফিরে গিয়ে আধুনিক উপায়ে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে তেমনি বেকারত্বের হার কমার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
খ. কৃষিভিত্তিক শিল্প (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) : উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে (যেমন- জুস, চিপস, আচার, ফ্রোজেন ফুড) বাজারজাত করলে পণ্যের মূল্য সংযোজন হয়। সেই সাথে অনেক কর্মসংস্থান তৈরি হয়। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর হলেও কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাপক হারে না থাকা কৃষিভিত্তিক শিল্পকে নিরুৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি এখনো মোট কর্মসংস্থানের দুই-পঞ্চমাংশ, তবু বেশির ভাগ কাজ কম উৎপাদনশীল ও অনানুষ্ঠানিক। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং এবং বিতরণের মতো মূল্য সংযোজন কার্যক্রমের প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরো আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ আয় বাড়াতে পারে।
গ. প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যচাষ : পোলট্রি, ডেইরি এবং মাছ চাষকে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বাণিজ্যিক রূপ দিলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২. শিল্পের বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি :
ক. এসএমই ও কুটির শিল্প : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
খ. রফতানিমুখী শিল্পের প্রসার : শুধু তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর নির্ভর না করে চামড়া শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্লাস্টিক ও আইসিটি খাতে জোর দেয়া উচিত। রফতানিমুখী শিল্প বিশেষ করে পোশাক শিল্পে যেমন নারীশ্রমিকদের কর্মসংস্থান দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রাখছে। তবে এই খাতে এখনো নানা সমস্যা বিরাজমান। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈশ্বিক বাজারে তৈরী পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। গত বছর বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি বেড়েছে মাত্র দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি সাড়ে ১০, ভারতের ৫, কম্বোডিয়ার প্রায় ১৭, পাকিস্তানের ৬ ও ইন্দোনেশিয়ার ৫ শতাংশ বেড়েছে। পোশাক শিল্পের পর চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। এ শিল্পে কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ (ট্যানারি) এবং চূড়ান্ত পণ্য (জুতো, ব্যাগ, জ্যাকেট ইত্যাদি) তৈরির প্রতিটি ধাপে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয় ধরনের বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়।
গ. হস্তশিল্প ও পর্যটন : দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রসার এবং স্থানীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়। বাংলাদেশের হস্তশিল্পের প্রসারে সঠিক অর্থায়ন, আধুনিক ডিজাইন ও প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং অত্যন্ত জরুরি। বৈশ্বিক বাজারের বিশাল সুযোগ ধরতে কারুশিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও নীতি-সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স, যুগোপযোগী ডিজাইন ও উদ্ভাবন, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তাদানের মাধ্যমে এ শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করা যেতে পারে।
৩. শিক্ষিত তরুণদের সম্পৃক্ততা : শিক্ষিত তরুণদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা যেতে পারে।
ক. উদ্যোক্তা তৈরি : শিক্ষিত তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষি ও শিল্প খাতে উদ্যোক্তা হতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা নেয়া যেতে পারে। বেকার তরুণদের মাঝে উদ্যোক্তা তৈরি এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি ও শিল্প খাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। এই দুই খাতের বহুমুখী ব্যবহারে কর্মহীন যুবকরা সহজে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারছে। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণরা প্রচলিত কৃষির পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক কৃষির দিকে ঝুঁকছে। হাইড্রোপনিক্স, মাটি ছাড়া চাষ এবং উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা স্টার্টআপ গড়ে তুলছে।
খ. স্টার্ট-আপ ও ইনোভেশন : আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ‘স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার’ ও ই-কমার্সভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা শিক্ষিত বেকারদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে বেকারত্ব নিরসনে স্টার্ট-আপ ও ইনোভেশন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১,২০০টির বেশি স্টার্ট-আপ সক্রিয় আছে, যা প্রায় ১৫ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সরকার ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনী ধারণায় অর্থায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ সহায়তায় এ খাত আরো সম্প্রসারিত করে যুব বেকারদের কাজে লাগাতে পারে।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করছে। এর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। তরুণদের একটি ক্ষুদ্র কৃষি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণেরা উন্নয়নের পথে নামলে দেশের অর্থনীতি সহজে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। তবে তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততায় কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো হলো— অনেক তরুণের কাছে কৃষি এখনো আকর্ষণীয় একটি পেশা হিসেবে বিবেচিত হয় না। এখনো কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণের অভাব। ভূমি ও কৃষিব্যবস্থার সংস্কারের অভাব। কৃষিতে তরুণদের সম্পৃক্ততা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কৃষিপণ্য রফতানি, কৃষি খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে আলোচিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলের বিবেচনায় নেয়া উচিত। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনায় গ্রামীণ এলাকায় বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়। এছাড়া বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল পার্টস, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি তৈরি শিল্পে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, যা কর্মসংস্থান বাড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, এক হাজার ২০০টির বেশি কারখানা বন্ধ ও আংশিক চালু ইউনিট আছে। এসব বন্ধ কারখানা চালুর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যা সঠিকভাবে তদারকি করলে ও সত্যিকারভাবে বন্ধ কারখানা চালু বা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান চালু করলে দেশের বেকারত্ব নিরসন ও অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার সম্ভব।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার