বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮ বছর পেরিয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর অনেক পথ পেরিয়েছে বিএনপি। অনেক ঝড় গেছে। অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। ক্ষমতায় গেছে। ক্ষমতার বাইরে থেকেছে। আন্দোলন করেছে। আন্দোলনের মুখে পড়েছে। কিন্তু বিএনপির ইতিহাসকে শুধু ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতার বাইরে থাকার ইতিহাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এই ইতিহাস আসলে তিনটি নেতৃত্বের ইতিহাসও। জিয়াউর রহমানের বিএনপি। খালেদা জিয়ার বিএনপি। তারেক রহমানের বিএনপি। তিনটি সময়। তিনটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ। তাহলে প্রশ্ন হলো— জিয়ার বিএনপি থেকে তারেকের বিএনপি কতটা বদলেছে?

আরো বড় প্রশ্ন— নেতৃত্ব বদলেছে। সময় বদলেছে। কিন্তু বিএনপির আদর্শ কি একই আছে? এই প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিএনপি দীর্ঘদিন পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি সরকার গঠন করেছে। ক্ষমতায় ফেরার মুহূর্তটি তাই শুধু বিজয় উদ্যাপনের মুহূর্ত নয়। এটি আত্মপর্যালোচনারও সময়।

জিয়ার বিএনপি : একটি নতুন রাজনৈতিক প্রকল্প

বিএনপির জন্ম হয়েছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতায়। দেশ তখন অস্থির। রাষ্ট্র তখন নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল। অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সমাজে বিভাজন প্রবল। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটির শুরু থেকেই একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। এটি ছিল বড় পরিসরের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ এখানে জায়গা পেয়েছিলেন। এমনকি প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল।

জিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। ছিল বহুদলীয় রাজনীতি। ছিল জাতীয় ঐক্যের কথা। ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ছিল আত্মনির্ভরতার ধারণা। ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তনের চেষ্টা। ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই চিন্তাগুলোকে একটি রাজনৈতিক কাঠামো দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ বিএনপি শুরুতে শুধু একটি নির্বাচনী দল হিসেবে তৈরি হয়নি। এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেও নিজেকে হাজির করেছিল।

জিয়া একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন— বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পরিচয় কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজেছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যে। এই জাতীয়তাবাদ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি বিকল্প রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। এর কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নিজস্ব পরিচয়।

তবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন চিন্তা একরৈখিক ছিল না। দলটির ভেতরে নানা রাজনৈতিক ধারার মানুষ ছিলেন। ফলে শুরু থেকেই বিএনপি ছিল একটি ‘বিগ টেন্ট’ দল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি মূল্যায়ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় এর সুস্পষ্ট আদর্শিক সংজ্ঞা ছিল না; দলটি প্রতিষ্ঠার পর তার আদর্শিক চরিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। কারণ এর অর্থ হলো— বিএনপির আদর্শ শুরু থেকেই পাথরে খোদাই করা ছিল না। সময়ের সাথে সেটি গড়ে উঠেছে।

এই জায়গাটি মনে রাখা জরুরি। কারণ আজও বিএনপির সামনে একই প্রশ্ন ফিরে এসেছে। সময় বদলেছে। তাই দলটির রাজনৈতিক দর্শনেরও কি নতুন ব্যাখ্যা দরকার?

খালেদা জিয়ার বিএনপি : দল থেকে গণ-আন্দোলন

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি কঠিন সঙ্কটে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা নেই। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি নেতৃত্বের সঙ্কটে পড়ে। এরপর রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া।

শুরুতে তিনি আসতে চাননি। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে টেনে আনে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

এখানেই বিএনপির চরিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটে। জিয়ার বিএনপি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটি দল। খালেদা জিয়ার বিএনপি হয়ে উঠল আন্দোলনের দল। রাজপথের দল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি দীর্ঘ সময় রাজপথে ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে আন্দোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। এখানে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন ছিল বিএনপিকে একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খালেদা সেটিকে জনগণের ঘরে ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটি বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপান্তরগুলোর একটি।

১৯৯১ সালের পর বিএনপি আবার রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে। ২০০১ সালেও দলটি বড় বিজয় অর্জন করে। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসেও খালেদা জিয়ার তিন দফা সরকার পরিচালনার অধ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনীতির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আপসহীনতা। দৃঢ়তা। সংগ্রামী ভাবমর্যাদা। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি লড়াই করে গেছেন। এক মুহূর্তের জন্য আপস করেননি। এসব তাকে শুধু বিএনপির নেত্রী বানায়নি। একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে তাকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছিল।

রাজনীতিবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী খালেদা জিয়াকে শুধু বিএনপির জন্য নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও এক ধরনের ‘মঁধৎফরধহ ভরমঁৎব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীল ও অভিজ্ঞ উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

এই মূল্যায়ন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি শুধু দলীয় নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতীক।

তারপর তারেক রহমান

এখন বিএনপির সামনে নতুন সময়। জিয়া নেই। খালেদা জিয়াও নেই। দলের নেতৃত্বে তারেক রহমান। এখানেই প্রশ্ন উঠছে— তারেক রহমানের বিএনপি কি জিয়া ও খালেদা জিয়ার বিএনপিরই ধারাবাহিকতা? নাকি এটি নতুন বিএনপি? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। একদিকে তারেক রহমান জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান। বিএনপির নেতৃত্বও তার কাছে এসেছে সেই উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায়। অন্যদিকে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।

জিয়া যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তারেক রহমানের বয়স ছিল ১২ বছর। খালেদা জিয়া যখন দলের নেতৃত্ব নেন, তখন তার বয়স ছিল ৩০-এর ঘরে। তারেক রহমান এখন ৬০-এর কাছাকাছি বয়সে দলের পূর্ণ নেতৃত্ব নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে অন্যভাবে তৈরি করেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। জিয়া ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা। খালেদা জিয়া ছিলেন সংগ্রামের নেত্রী। তারেককে হতে হবে রূপান্তরের নেতা। কারণ তার সামনে যে বাংলাদেশ, সেটি জিয়া বা খালেদা জিয়ার সময়ের বাংলাদেশ নয়। নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রশ্ন। আজকের বাংলাদেশ অনেক বেশি তরুণ। অনেক বেশি ডিজিটাল। অনেক বেশি সংযুক্ত।

মানুষের তথ্য পাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মাধ্যমও অনেক বেশি। তরুণরা এখন শুধু রাজনৈতিক দলের সভায় যায় না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতি করে। তারা ইউটিউবে রাজনীতি বিশ্লেষণ করে। পডকাস্ট শোনে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি দেখে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করে।

সবচেয়ে বড় কথা— তারা প্রশ্ন করে। কেন? কিভাবে? কার জন্য? এই প্রজন্মের কাছে শুধু ঐতিহ্য দিয়ে রাজনীতি করা কঠিন। ‘আমার বাবা এই দল করেছেন’-এটি তাদের কাছে যথেষ্ট নয়। ‘আমরা এত বছর আন্দোলন করেছি’-এটিও যথেষ্ট নয়। তারা জানতে চায়— আগামী দিনের বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার পরিকল্পনা কী? এখানে তারেক রহমানের বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জিয়ার উত্তরাধিকার থাকবে। খালেদা জিয়ার সংগ্রামের ইতিহাস থাকবে। কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে নতুন বাস্তবতায় অনুবাদ করতে হবে।

আদর্শ কি বদলেছে?

এটিই মূল প্রশ্ন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতিতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ঐক্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আজও বিএনপি এসব মূল্যবোধের কথা বলে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনেও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থানের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আদর্শিক ধারাবাহিকতার কথাও বলেছেন।

তাহলে কি কিছুই বদলায়নি? অবশ্যই বদলেছে। আদর্শের ভাষা একই থাকতে পারে; কিন্তু আদর্শের প্রয়োগ বদলাতে হয়। উদাহরণ দেয়া যাক। জিয়ার সময়ে জাতীয়তাবাদ ছিল রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্ন। আজ জাতীয়তাবাদকে শুধু পরিচয়ের প্রশ্নে আটকে রাখলে হবে না।

আজ জাতীয়তাবাদ মানে কী? একজন তরুণের জন্য জাতীয়তাবাদ কি শুধু পতাকা? নাকি একটি ভালো চাকরির সুযোগ? একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়? একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন? একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা? একটি নিরাপদ সমাজ? একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। কারণ মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় এখন শুধু স্লোগানে তৈরি হয় না। জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েও তৈরি হয়।

খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারও কি শুধু স্মৃতি?

খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ছিল গণতন্ত্রের জন্য লড়াই। তার আপসহীনতার কথা বলা হয়। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা বলা হয়।

কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে যদি শুধু ছবি, পোস্টার আর স্মরণসভায় রাখা হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক অর্থ হারিয়ে যাবে। খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক আচরণে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দলের ভেতরে মতের জায়গা রাখতে হবে। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা যাবে না। ক্ষমতায় থেকে বিরোধী দলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হবে। এগুলোই হবে খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের বাস্তব পরীক্ষা।

নতুন বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— বিএনপিকে শুধু উত্তরাধিকারনির্ভর দল থেকে একটি আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এই পরিবর্তন সহজ নয়। কারণ বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বকেন্দ্রিক দল হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলই দীর্ঘদিন ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— দুই দলকেই ঢ়বৎংড়হধষরঃু-পবহঃৎবফ ঢ়ধৎঃু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানের সেই নেতৃত্বের জায়গা নেয়াকে তিনি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কি ভবিষ্যতের বিএনপির জন্য যথেষ্ট? সম্ভবত নয়। কারণ একটি আধুনিক রাজনৈতিক দল শুধু একজন নেতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। প্রতিষ্ঠান দরকার। নীতি দরকার। গবেষণা দরকার। দক্ষ নেতৃত্ব দরকার। দলের ভেতরে জবাবদিহি দরকার। নতুন নেতৃত্ব তৈরির ব্যবস্থা দরকার। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্ব।

জিয়ার বিএনপির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন মানুষকে রাজনীতিতে নিয়ে আসা। এখন তারেক রহমানের সামনে একই ধরনের কাজের সুযোগ আছে। নতুন প্রজন্মকে শুধু কর্মী বানালে হবে না; তাদের নীতিনির্ধারক বানাতে হবে। দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতিতে আসা তরুণদের শুধু মিছিলের সামনে দাঁড় করানো নয়। তাদের রাজনৈতিক চিন্তার জায়গা দিতে হবে।

বিরোধী দলে থাকলে পরিবর্তনের কথা বলা সহজ। ক্ষমতায় এসে পরিবর্তন করা কঠিন। কিন্তু এখন বিএনপির সামনে সেই সুযোগ আছে। এখন দলটি প্রমাণ করতে পারে— নতুন বিএনপি কেমন। প্রশাসনে দলীয়করণ কমাতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে। বিরোধী মতকে সম্মান করতে পারে। এগুলো করলে বিএনপি তার রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে তৈরি করতে পারবে। আর যদি পুরনো ক্ষমতার সংস্কৃতিই ফিরে আসে, তাহলে নতুন বিএনপি আর পুরনো বিএনপির মধ্যে পার্থক্য কোথায়— এই প্রশ্ন উঠবেই।

উত্তরাধিকার বনাম রূপান্তর নয়

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো ‘উত্তরাধিকার বনাম রূপান্তর’ নয়; বরং উত্তরাধিকার থেকে রূপান্তর। জিয়ার বিএনপি থেকে বিএনপি শিখতে পারে রাষ্ট্রচিন্তা। খালেদা জিয়ার বিএনপি থেকে শিখতে পারে গণ-আন্দোলন। তারেকের বিএনপিকে যোগ করতে হবে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা, নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্র। তাহলেই তিনটি সময়ের মধ্যে একটি সেতু তৈরি হবে। অন্যথায় তিনটি সময় আলাদা আলাদা অধ্যায় হয়ে থাকবে।

জিয়ার বিএনপি ছিল প্রতিষ্ঠার বিএনপি। খালেদার বিএনপি ছিল সংগ্রামের বিএনপি। এখন তারেকের বিএনপিকে হতে হবে রূপান্তরের বিএনপি। এটিই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। কারণ জিয়ার নাম উত্তরাধিকার দিতে পারে। খালেদার সংগ্রাম-অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ কেউ উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে যায় না। ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হয়। আর সেই ভবিষ্যৎ তৈরির দায়িত্ব এখন তারেক রহমানের।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— বিএনপি কতবার ক্ষমতায় এসেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো— ৪৮ বছর পর বিএনপি আসলে কোন রাজনৈতিক দল হতে চায়? জিয়ার বিএনপি? খালেদার বিএনপি? নাকি তাদের উত্তরাধিকার ধারণ করে একটি নতুন বিএনপি? সম্ভবত উত্তরটি হবে— তিনটিই।

তবে শর্ত আছে। নতুন বিএনপিকে পুরনো বিএনপির কেবল নাম ও স্মৃতি বহন করলে চলবে না। তাকে পুরনো বিএনপির মূল্যবোধকে নতুন সময়ের ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। জাতীয়তাবাদকে নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের সাথে যুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রকে দলের ভেতরেও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উন্নয়নকে মানুষের জীবনমানের সাথে যুক্ত করতে হবে।

আর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ব্যক্তির ওপর থেকে প্রতিষ্ঠানের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

তাহলেই বলা যাবে— জিয়ার বিএনপি থেকে তারেকের বিএনপি বদলেছে। কিন্তু আদর্শ হারিয়ে নয়। সময়কে বুঝে। বাস্তবতাকে মেনে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে। নতুন প্রজন্মকে সাথে নিয়ে। আর সেটিই হবে বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপান্তর।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন