বিগত ছয় মাসে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো স্বাধীন-সার্বভৌম মর্যাদার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সাহসী প্রচেষ্টা। বিভিন্ন বিষয়ে ব্যর্থতা থাকলেও হাসিনা সরকারের ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসায় দেশের মানুষ জিয়ার আদর্শের বিএনপিকে দেখতে চাচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘মক্কা চুক্তি’ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সংসদে দেয়া বক্তব্য দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে।
মক্কা চুক্তির উৎপত্তি
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তৈয়ব এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি ত্রিদেশীয় ‘যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সম্পন্ন করেন। চুক্তিতে যেকোনো সমমনা মুসলিম দেশের জন্য যুক্ত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আরো ছয়-সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের এতে যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এই চুক্তিতে ইরানের সংযুক্তি নিয়েও আলোচনা শোনা যাচ্ছে। আমন্ত্রণ পেলে বাংলাদেশও ইতিবাচক সাড়া দেবে বলে জানা যাচ্ছে।
পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সামারিক বিনিময় এবং সখ্য প্রায় ৫০ বছর ধরে চলেছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে তারা একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এক বছর পর তুরস্ক এতে যোগ দিয়ে ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পরিণত করে। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফল হলো মক্কা চুক্তি। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইসরাইলের সম্মিলিত আক্রমণে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের কঠিন প্রতিরোধ আমেরিকার শক্তিমত্তার ‘মিথ’ ভেঙে দেয়। যুগ যুগ ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়ে যায়। অন্য দিকে তুরস্ক ক্রমাগত ইসরাইলের হুমকির শিকার হচ্ছে। ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য তুরস্ক বলে বোদ্ধারা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। তা ছাড়া কুর্দিদের থেকে স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দরকার তুরস্কের। আর পাকিস্তান শক্তিশালীভাবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের তোপের মুখে থাকে। পাকিস্তান সামরিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাসী হলেও অর্থনৈতিকভাবে ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় অনেক পিছিয়ে। ফলে এই দেশ তিনটি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে এই মক্কা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ তিনটি দেশের সম্মিলিত সক্রিয় সামরিক সদস্য সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি হবে। পাঁচ হাজার ৬০০টির বেশি মেইন ব্যাটল ট্যাংক (MBT) এবং এক হাজার ১০০টিরও বেশি আধুনিক রণতরী, যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রযুক্তি ও শক্তিশালী ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তা ছাড়া পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা। চুক্তিতে বলা হয়েছে— চুক্তিবদ্ধ দেশ তিনটির যেকোনো একটি আক্রমণের শিকার হলে বাকি দু’টি দেশের ওপরই হামলা বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই যৌথ সামরিক প্রতিরোধের কারিগরি ও কৌশলী দিকগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। তবে চুক্তির ফলে এতটুকু হবে যে, এদের যেকোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো বৈরী পক্ষের শক্তি প্রয়োগের চিন্তা যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ করেই করতে হবে। এই দেশ তিনটির মধ্যে অবশ্যই সামরিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। প্রতিরক্ষা শিল্প, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, গোয়েন্দা বিনিময়, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার শিল্প এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামেও বিপ্লব ঘটতে পারে।
মক্কা চুক্তির প্রভাব
চুক্তিটির আঞ্চলিক প্রভাব তো রয়েছেই, এর সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক প্রভাবও পড়তে পারে। বৈশ্বিকভাবে আমেরিকা শাসিত একক মেরুর বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে সুদূরপ্রসারী প্রভাবের অংশ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলমুক্ত এই জোটের বিষয়ে ইরানের নিরপেক্ষ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জানা যাচ্ছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান, ইরানকে আস্থায় নিয়েই চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এমনকি ইরানকে এই জোটে যুক্ত করার বিষয়ে তারা ইতিবাচক চিন্তা করছে বলে জানা যায়। চীন এবং রাশিয়াও মক্কা জোটকে হুমকি হিসেবে না দেখে বরং সহযোগী হিসেবে দেখতে পারে। পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম দেশ এতে যুক্ত হলে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইল ও ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে একটি কান্ট্রোল এক্সিস গঠন করতে পারে। তবে আঞ্চলিকভাবে মক্কা চুক্তির প্রভাব এখনই ফুটে উঠেছে। এরই মধ্যে ইসলাইলের দীর্ঘদিনের একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের তৎপরতা সামনে এসেছে। সাইপ্রাস, গ্রিস এবং ভারতকে নিয়ে এই জোটের আলোচনা অনেকদূর এগিয়েছে বলে জানা যায়। ভারত-ইসলাইল বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতাও দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধে ভারতের ৯টি কোম্পানি ইসরাইলকে বিভিন্ন অস্ত্রের দুই হাজার ৫৯৬টি চালান পাঠিয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। মক্কা চুক্তির ফলে চিরবৈরী পাকিস্তানের হুমকি মোকাবেলায় ইসরাইলি সামরিক সরঞ্জাম এবং অস্ত্রপাতি ভারতের অস্ত্রভাণ্ডারে প্রবেশ করে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার গতিকে দ্বিগুণ করে দিতে পারে। মক্কা চুক্তির একটি অবধারিত প্রভাব হলো— ‘ওআইসি’ সংস্থাটি গতি পাবে এবং নিজস্ব অরবিট বা কক্ষে ফিরে আসতে পারে। সেটি হলে অন্যান্য মুসলিম দেশও মক্কা চুক্তিতে আগ্রহী হয়ে ওঠতে পারে। ফলে মুসলিম বিশ্বে শুধু সামরিক নয় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের পথ প্রশস্থ হবে।
বাংলাদেশ কোন পথে যাবে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতি সংসদে এবং সংসদের বাইরে বক্তব্যগুলোতে মনে হচ্ছে, সরকার এই মক্কা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করছে। এতে বাংলাদেশের লাভ-লোকসানের বিতর্ক থাকলেও সবচেয়ে বড় সুবিধা অর্জন করবে সরকারি দল। এ দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষের হৃদয়ে মক্কা অবস্থান করে। গত ১৬-১৭ বছর ধরে ভারতের আধিপত্যবাদী নির্যাতনে অতিষ্ঠ বাংলাদেশের নাগরিকরা ভারতমুক্ত কোনো নিরাপদ জোটে যোগদানের বিষয়ে আশান্বিত হবে। কাজেই মক্কা চুক্তিতে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিগত ছয় মাসে সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যর্থতা ঢেকে ফেলার এই সুযোগকে সরকার কাজে লাগাতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়।
এই মুহূর্তে দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের প্রদর্শিত বৈরিতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরকারের জন্য মক্কা চুক্তি উত্তম বিকল্প হতে পারে। বিরোধী দলও মক্কা চুক্তির পক্ষেই সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আর বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে চীন-যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের টানাহ্যাঁচড়া এড়িয়ে চলতে মক্কা চুক্তি একটি উত্তম ভারসাম্যের বিষয় হতে পারে। একই সাথে এই চুক্তি আমাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পুনর্বাসনের সুযোগ উন্মোচন করবে বলে মনে হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশের প্রতিরক্ষার জন্য অবশ্যই আমাদের নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনায় নিজস্ব সামরিক বলয় খুঁজে নেয়ার স্বাধীন-সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, অস্ত্রসম্ভার, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা আদায়ের সুযোগ আমাদের বিবেচনায় নিতেই হবে।
আধিপত্যবাদের অবসানে সহায়ক হবে
১৯৭১ সালে আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড— বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। ২০২৪ সালে পেয়েছি পুরোপুরি স্বাধীনতা অর্জনের আরেক সুযোগ। মূলত আওয়ামী শাসনের মোট ২৫ বছর আমাদের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে ইজারা দেয়া ছিল। বিশেষ করে শেখ হাসিনার গেল ১৭ বছর আমরা পুরোপুরিই ভারতের করায়ত্তে আবদ্ধ ছিলাম। এ জন্যই আওয়ামী লীগের পতনকে ভারত নিজেদের পতন বলে ধরে নিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগদান করলে ভারতের আধিপত্যবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হবে বলে অনেক বাংলাদেশপন্থী মনে করেন। এতে ভারতের অস্বস্তিতে পড়ার কোনো কারণ নেই। তবে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পুরোপুরি ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ার সুযোগ হতে পারে। একাত্তরের আগে পাকিস্তানকে ভারত যেমনটি সমীহ করত, এখন ভারতের দুই পাশের দুই স্বাধীন দেশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে তার চেয়েও বেশি সমীহ করতে বাধ্য হবে তারা। এতে যখন-তখন বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের স্বার্থ উদ্ধার, একতরফা স্বার্থ চাপিয়ে দেয়া, সীমান্তে যথেচ্ছ বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করা, যখন খুশি আমদানি-রফতানি বন্ধ করে বাংলাদেশের মানুষকে শাস্তি দেয়া— ইত্যাদি সব ধরনের ভারতীয় অপকর্ম বন্ধ হয়ে যাবে বলে অনেকেই মনে করেন।
ভারতের মিডিয়া মক্কা চুক্তিতে আমাদের ইতিবাচক মনোভাব দেখে শোরগোল শুরু করেছে এবং ভারতের এদেশীয় চরেরা-কিছু চিহ্নিত সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া— মক্কা চুক্তিবিরোধী কোরাস গাওয়া শুরু করেছে। অথচ এই চুক্তির উদ্দেশ্যই হলো শুধু প্রতিরক্ষা; অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কোনো আকাঙ্ক্ষা বা ইঙ্গিত এতে নেই। তা ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে তার বন্ধু বা জোট বেছে নিতে কোনো প্রতিবেশীর আপত্তি থাকার কথা নয়। আমরা তো আত্মরক্ষার জন্যই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিরক্ষাবাহিনী গড়ে তুলেছিলাম। আমাদের অন্য কোনো দেশকে কখনো আক্রমণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। তবে এটি পরিষ্কার যে, মক্কা চুক্তিতে যোগদান করা বা না করা পুরোপুরি বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়।
মক্কা চুক্তিতে যোগদানের আগে অবশ্যই আমাদেরকে এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করতে হবে। বিশেষজ্ঞ আলোচনা ও মতামত নেয়া এবং সবশেষে সংসদে প্রকাশ্যে আলোচনার পরই সিদ্ধান্ত নিলে সেটি হবে শক্তিশালী জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন। এর কারিগরি সুবিধা-অসুবিধা, ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও অর্থনীতির প্রসার ইত্যাদি বিস্তারিত আলোচনার পর মক্কা চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্তই হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় সিদ্ধান্ত।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email : maksud2648@yahoo.com