২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনবান্ধব প্রশাসন এবং সর্বোপরি এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হবে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সে আশা পূরণের ন্যূনতম পরিবেশও গত ছয় মাসে নির্বাচিত সরকার বা শাসকশ্রেণী তৈরি করতে পারেনি। বরং তাদের কর্মকাণ্ড ও নানা বক্তব্যে মনে হচ্ছে, জনগণের প্রত্যাশা এবং গণভোটের রায় স্বজ্ঞানে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ রাজপথে নেমেছিল, যে গণরায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন আদৌ হবে কি?
নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। তারপরও নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল পাশাপাশি রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা পাওয়া যায়।
প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার বিএনপির পক্ষে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ জনগণের বেশ বড় অংশ একদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছে, অন্যদিকে সেই সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্বও বর্তমান সরকারকে দিয়েছে। এই দুই রায়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে; জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে এবং সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারকে তথা বিএনপিকে দিয়েছে।
দুঃখজনক হলো, নির্বাচন-পরবর্তী মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সেই জন-আস্থার ওপর ছাই ছিটানো হচ্ছে।
রাষ্ট্র কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি বা ব্যর্থতা যেমন হতাশাজনক, তেমনি জনজীবনের সঙ্কটও এখন গুরুতর রূপ নিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সঙ্কট, লোডশেডিং, বাসাবাড়ি, পাম্প ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের সঙ্কট— সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। কোথাও পরিবহন খাত সঙ্কটে, কোথাও উৎপাদন ব্যাহত, কোথাও শিল্পকারখানা কার্যত স্থবির।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য হওয়া উচিত আরো সংবেদনশীল, পরিমিত ও দায়িত্বশীল। কিন্তু সরকারের মন্ত্রীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক সচিব ও কর্তাদের নানা বেফাঁস মন্তব্য জনমনে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন, কয়টি কারখানা বন্ধ হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘কারখানা বন্ধ’ বলতে কি শুধু কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফ্যাক্টরিতে তালা ঝুঁলিয়ে দেয়াকেই বোঝায়? শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটে উৎপাদন বন্ধ থাকা, শ্রমিকদের কর্মহীন সময় কাটানো, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং কারখানাগুলো উৎপাদনক্ষমতার নিচে চলে যাওয়াও কি সঙ্কটের অংশ নয়?
কারখানার দরজায় তালা না ঝুললেও যদি উৎপাদন বন্ধ থাকে, শ্রমিক কাজ না পান, উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যেতে না পারেন, তাহলে সেটিকে কি সুস্থ শিল্পপরিবেশ বলা যায়?
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও জনগণকে স্বস্তি দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত ছিনতাই, চুরি, সঙ্ঘাতের খবর আসছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিস্তারে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক হানাহানি ও সঙ্ঘাতও জনমনে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করছে। অথচ এসব মৌলিক সমস্যার কার্যকর সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি যেন বেশি দৃশ্যমান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীল মন্ত্রী বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই বছর লাগতে পারে। ধরে নিলাম, বাস্তবতার কারণে সত্যিই দুই বছর সময় প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুই বছর দেশের অর্থনীতি কিভাবে চলবে? শিল্পোদ্যোক্তারা কিভাবে উৎপাদন করবেন? শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কিভাবে নিশ্চিত হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কি এমন দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যেখানে বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ মৌলিক উৎপাদন অবকাঠামোর সঙ্কট কাটাতে আরো দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে?
বিনিয়োগ শুধু নীতির ওপর নির্ভর করে না। এজন্য প্রয়োজন আস্থা, স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ না পায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ আসবে কিভাবে?
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের একটি বক্তব্য কখনো বাজারে, শিল্প খাতে এবং সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তাদের ‘বেফাঁস মন্তব্যের’ সুযোগ নেই। জনগণ এখন আশ্বাস নয়, সমাধান দেখতে চায়। মানুষ জানতে চায়, সঙ্কট সমাধানে সরকারের পরিকল্পনা কী? কত দিনে কী করা হবে? জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা কোথায়? শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো— সমস্যা অস্বীকার না করে এর গভীরে যাওয়া এবং দ্রুত বাস্তবসম্মত কর্মপন্থা হাতে নেয়া। শুধু ‘সময় লাগবে’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সময়ের প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু সেই সময়ের প্রতিটি ধাপে জনগণকে অগ্রগতি দেখাতে হবে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই আস্থার যথাযথ মর্যাদা দেয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটিও কোনো রাজনৈতিক সুবিধামতো উপেক্ষা করার বিষয় নয়।
রাষ্ট্রের পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়; পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে। বাজারে স্বস্তি ফিরবে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়বে, শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
গণরায়ের মর্যাদা রক্ষা এবং জন-আস্থা ধরে রাখার একমাত্র পথ কথার চেয়ে কাজে অগ্রাধিকার দেয়া। সঙ্কট স্বীকার করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। দুঃখজনকভাবে জাতীয় এই সঙ্কটের সময়ে মিডিয়া, টকশো থেকে রাজপথ— সবখানেই অযাচিত ও অর্বাচীন কথাবার্তায় পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। কে কার ছাত্র, কে কার চেয়ে যোগ্য, কে কাকে ছাড়িয়ে গেল— এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক যেন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সঙ্কটের সময়ে সরকারের আচরণ হওয়া উচিত অভিভাবকের মতো। কিন্তু ইগোর রাজনীতি ও আত্মতুষ্টির আবরণে সরকার সেই ভূমিকা পালনে অপারগ হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। বরং সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের রাজপথ ও ক্যাম্পাস দখলের শোডাউন এবং সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তির তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করছে। কেউ কেউ যেন নিজেদের সরকারের সবচেয়ে একনিষ্ঠ অনুগত প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। অথচ সরকারের প্রতি আনুগত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হওয়া উচিত, জনগণের সঙ্কটকে নিজের সঙ্কট হিসেবে দেখা। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা নয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিরোধী দল যখন জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করছে, তখন সেটিকে যদি সরকার এমনভাবে দেখে যে, এর আড়ালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাহলে সেটিও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু এমন আশঙ্কা থাকলেও সমাধানের পথ রাজপথে শক্তি প্রদর্শন নয়। সমাধানের পথ হতে পারে—আলোচনা।
সরকার চাইলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক টেবিলে বসতে পারে। জ্বালানি সঙ্কট উত্তরণে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি, জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হতে পারে। সঙ্কটকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সুযোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করাই হবে পরিণত রাজনীতির পরিচয়।
অন্যথায়, জাতীয় সঙ্কট থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে, পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে।
জাতীয় সঙ্কট থেকে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, আর সেই অস্থিরতা যদি ক্রমেই রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার দিকে গড়ায়, তাহলে তার দায় কোনো একক পক্ষ এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই এখন প্রয়োজন কে কাকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করবে সেই প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বরং কিভাবে জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলা করে দেশকে স্থিতিশীল রাখা যায়, সেই বিষয়ে একটি সর্বদলীয় ও জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু যখন হয়ে ওঠে কে কার ছাত্র হওয়ার যোগ্য, কে কাকে ছাড়িয়ে গেল— তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট নিয়ে ভাবার সময় তাদের কোথায়?
শুধু সরকার নয়, বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। জাতীয় সঙ্কটকে কেন্দ্র করে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক রাজনীতি দরকার। প্রতিটি সঙ্কটকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মঞ্চ বানানো যেমন সমাধান নয়, তেমনই সরকারেরও প্রতিটি প্রতিবাদকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। জনগণের দুর্ভোগকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত না করে সমাধানের দাবিতে পরিণত করতে হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান, ইগো নয়, অভিভাবকসুলভ আচরণ করুন। বয়ান নয়, কর্মপরিকল্পনা দিন। শোডাউন নয়, সংলাপ করুন। দায় এড়িয়ে সময় চাইবেন না; বরং সময়কে কাজে লাগান, দৃশ্যমান ফলাফল দিন। কারণ, জনগণ আর রাজনৈতিক বয়ান শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, সুলভ বাজার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, সচল শিল্প, কর্মসংস্থান এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্র। তারা আর কারো রাজনৈতিক ইগোর কাছে তাদের ন্যায্য অধিকার বন্ধক রাখতে রাজি নয়।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতি পর্যবেক্ষক