মো: ওবায়দুল্লাহ

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে মন্তব্য করেন, ‘ভারত ও রাশিয়াকে আমরা হারিয়েছি অন্ধকারতম চীনের কাছে।’ এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে। ভারতকে এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্যতম সহযোগী হিসেবে ধরা হয়েছে। তাই মার্কিন রাজনীতিতে এটি স্পর্শকাতর ইস্যু। প্রশ্ন হলো- ভারত কি সত্যিই রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকছে, নাকি ট্রাম্প রাজনৈতিক কারণে বাস্তবতার সরলীকরণ করছেন?

ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীর। সোভিয়েত আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মস্কো ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে অন্যতম প্রধান অংশীদার। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভারতের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। এর আগের দশকে এই হার ছিল আরো বেশি, প্রায় ৬৪ শতাংশ। ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরাইল ভারতের প্রতিরক্ষা বাজারে অবস্থান মজবুত করছে। কিন্তু রাশিয়ার গুরুত্ব তাতে কমে যায়নি। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মস্কোর সাথেই চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি সঙ্কটে পড়লে ভারত সুযোগ নেয় সস্তা অপরিশোধিত তেল আমদানি করার। ২০২৪ সালে ভারতের তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই রাশিয়া থেকে এসেছে। এই বাণিজ্যিক লেনদেন নয়াদিল্লির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সস্তা জ্বালানি সরবরাহের কারণে মস্কোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। তবে এটিকে কৌশলগত ঝুঁকে পড়া বলা যাবে না। কারণ রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতকে অনেক বেশি সুবিধা দেয়। যেমন- ভারত সাশ্রয়ী তেল পাচ্ছে, প্রতিরক্ষা চাহিদা মেটাচ্ছে, একই সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করছে।

অন্য দিকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক একেবারেই আলাদা ধরনের। এক দিকে বহুপক্ষীয় ফোরামে, যেমন- ব্রিকস ও এসসিওতে ভারত এবং চীন একত্রে কাজ করে। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে উভয় দেশই আওয়াজ তোলে। তবে অন্য দিকে সীমান্তে সঙ্ঘাত, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতা এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা জিইয়ে রেখেছে। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ এখনো দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে রেখেছে। সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়নি। ভারত অভ্যন্তরীণভাবে শত শত চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে, বিদেশী বিনিয়োগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং প্রযুক্তি খাতে চীনের প্রভাব ঠেকাতে সচেষ্ট হয়েছে। একই সাথে ভারত মহাসাগরে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলকে নিজেদের প্রভাববলয় দুর্বল করার সরাসরি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চীনের সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৪ সালেও ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। এই পরিসংখ্যান নয়াদিল্লির কাছে অস্বস্তিকর কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সম্পর্ককে সহযোগিতা হিসেবে দেখানো গেলেও বাস্তবে এটি প্রতিযোগিতা, সন্দেহ ও সীমিত কূটনীতির মিশেল। ভারতের জন্য চীন এক দিকে বড় বাজার ও বহুপক্ষীয় অংশীদার, অন্য দিকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্ক গত দুই দশকে অভূতপূর্বভাবে প্রসারিত হয়েছে। দুই দেশই একে অপরকে ‘গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কোয়াড জোটের অংশ হিসেবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া একসাথে কাজ করছে মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তুলতে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামরিক ড্রোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি পর্যন্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এখন ভারতের সামরিক শক্তিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণায়ও দুই পক্ষের সহযোগিতা বাড়ছে। মার্কিন কোম্পানিগুলো ভারতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করছে, যা দেশটিকে একটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করছে। তবে সম্পর্কের মধ্যে সবসময় মসৃণতা নেই। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রফতানি পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, রাশিয়ার তেল আমদানির কারণে চাপ বাড়িয়েছে, এমনকি মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব আইন নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে। তারপরও নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন পরস্পরকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবেই দেখে। কারণ চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় তাদের পরস্পরকে প্রয়োজন।

এই তিনটি সম্পর্ককে যদি একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে বোঝা যায়- ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তবতার কেবল একটি খণ্ডচিত্র। চীন-রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, এমন বক্তব্য একতরফা ও অতিসরলীকৃত বিশ্লেষণ। নয়াদিল্লি তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে রেখে বহুমাত্রিক কূটনীতি অনুসরণ করছে। এটি একবিংশ শতাব্দীর জোট-নিরপেক্ষ নীতির আধুনিক রূপ, যা আজ ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ নামে পরিচিত।

ট্রাম্পের মন্তব্য মূলত মার্কিন ঘরোয়া রাজনীতির প্রতিফলন। তিনি চীনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে আবারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত যদি ওয়াশিংটনের সব দাবির সাথে একমত না হয়, তবে তাকে তিনি প্রতিপক্ষের শিবিরে পড়ে গেছে বলে মনে করেন। কিন্তু নয়াদিল্লি ভালোভাবেই জানে, চীনের সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন, আবার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। একই সাথে বহুপক্ষীয় ফোরামে নেতৃত্ব বজায় রাখতে দুই দিকেই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

সমস্যা হলো- মস্কো ও বেইজিংয়ের সাথে ভারতের যোগাযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে সত্যিই ঝুঁকি রয়েছে ভারতের আরো বেশি মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার। তাই ওয়াশিংটনের জন্য বিচক্ষণ নীতি হবে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক অটোনমিকে সম্মান জানানো এবং অংশীদারত্ব আরো সংহত করা।

আজকের ভাঙা-গড়ার বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারত বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে। এটি কোনো একক শিবিরে নয়; বরং বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া।

লেখক : পলিটিক্যাল সায়েন্সে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষারত