১৯৭৩ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হয়েছি। আমার বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান। বিধিমোতাবেক আরো দু’টি বিষয় আমাকে পড়তে হবে। এর নাম ছিল তখন সাবসিডিয়ারি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ শিশুকাল থেকে। আমি ইতিহাস এবং বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সাবসিডিয়ারি হিসেবে গ্রহণ করি। বাংলার এক ক্লাসে আবুল কাশেম ফজলুল হকের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ক্লাসে পড়ানো থেকেই বুঝতে পারি তিনি বিদ্বান মানুষ। পরে এ-ও বুঝেছি, চিন্তা-চেতনায় তিনি অনন্য। তার আচার-আচরণ, কথা-বার্তায় স্বাতন্ত্র্য আছে। জ্ঞান ও আদর্শের প্রতি সতত আগ্রহের কারণে আমি স্যারের ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাই। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি।
বাংলা সাহিত্যের একজন নন্দিত লেখক হিসেবে সারা দেশে তার সমাদর ছিল। আমি যখন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সপ্তাহে প্রধান অতিথি করে নিয়েছিলাম। তিনি পরিবারসহ গিয়েছিলেন। তারপর থেকে অনেকটা পারিবারিক পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি অসংখ্যবার তার বাসায় গিয়েছি। কখনও তিনি আমাকে ডেকে নিয়েছেন। শেখ হাসিনার আমলের শুরুতে তিনি তার পরীবাগের বাসায় মৌলিক রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে গ্রন্থ রচনার তাগিদ দেন। আমি তাকে একটি সূচিপত্র দেখাই। তিনি সংযোজন-বিয়োজন করেন। পাণ্ডুলিপিটি মোটামুটি তৈরি হলেও বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে তখন সেটি প্রকাশিত হয়নি। এখন যখন আমি বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি এবং তাকে উৎসর্গ করব বলে মনস্থির করেছি, তখন আল্লাহ তাকে নিয়ে গেলেন। তিনি বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন না। কিন্তু অন্য সব প্রগতিশীল বা তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবীর মতো ধর্মের প্রতি তার বিরূপতা ছিল না। অসম্ভব সহনশীল, সংযমী ও সংস্কৃতিবান মানুষ ছিলেন তিনি।
তিনি রাজনীতি, সমাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গলদ নিয়ে অনবরত লিখেছেন। দৈনিক নয়া দিগন্তে একসময় কলাম লিখতেন। তার কলামগুলো আমার মতো হাজারো মানুষ মনোযোগ দিয়ে পড়ত। রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ সময়ে আমি তার দিকনির্দেশনা পেয়েছি। সেই সময়ে একজন বড় মাপের মানুষকে, যিনি অর্থ-কড়িতেও অনেক বড় ছিলেন, নিয়ে গিয়েছিলাম আবুল কাশেম ফজলুল হকের কাছে। ওই মহান মানুষটি ‘চেইঞ্জ কমিউনিকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সে প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা করার জন্য স্যার অনেকবার আমন্ত্রিত হয়েছেন। ধনাঢ্য ব্যক্তিটি চাচ্ছিলেন, নতুন করে একটি রাজনৈতিক দল করবেন। মধ্যপন্থা হবে তার আদর্শ। স্যার সায় দিয়েছিলেন। আমি একমত ছিলাম না। অবশেষে দু’জনকে আমি বোঝাতে সক্ষম হই, রাজনীতি আমাদের কাজ না। পরে ঘধঃরড়হধষ ওহঃবৎবংঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয নামে একটি থিংকট্যাংক গড়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটি গড়ার প্রান্তিক পর্যায়ে এই ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে ইন্তেকাল করেন। স্বাভাবিকভাবেই সে প্রতিষ্ঠানের যবনিকা ঘটে।

আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা বা না-ওঠার সাথে তার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সম্পর্ক তিনি রাখতেন না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চিন্তার শুদ্ধতা, উদ্দেশ্যের সততা। ফলাফল আসুক বা না আসুক, তিনি নিজের ভূমিকাটুকু পালন করে যেতেন এবং তারপর নিশ্চিন্তে সরে দাঁড়াতেন। এই যে নির্লিপ্ততা, একে অনেকেই ভুল বোঝেন। মনে করেন, লোকটি বুঝি উদাসীন, বাস্তবতা-বিবর্জিত। কিন্তু আমি যতটা বুঝেছি, এই নির্লিপ্ততা আসলে গভীর আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। যিনি জানেন তার কাজ কী, তিনি ফলাফলের জন্য উদ্বিগ্ন হন না। আবুল কাশেম ফজলুল হক জানতেন তার কাজ লেখা, চিন্তা করা, সমাজকে দেখানো তার নিজস্ব আয়নায়। প্রতিষ্ঠান বানানো তার কাজ ছিল না, তা তিনি অন্যের হাতে ছেড়ে দিতেন।
এই প্রসঙ্গে তার সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ পত্রিকার কথা না বললেই নয়। ১৯৮২ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পত্রিকা সম্পাদনা করে গেছেন, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া, কোনো বিজ্ঞাপনী রমরমা ছাড়া। আমি নিজে দেখেছি, কী নিষ্ঠার সাথে তিনি প্রতিটি সংখ্যার প্রতিটি লেখা পড়তেন, সম্পাদনা করতেন, তরুণ লেখকদের উৎসাহ দিতেন। ‘চার্বাক মতাবলম্বী’ এই পত্রিকা ছিল তার এক ধরনের সাধনা। যে সাধনার ফসল তিনি বিলিয়ে দিতেন নিঃশর্তে।
দৈনিক নয়া দিগন্তে তার কলাম নিয়েও কিছু বলা দরকার। আমার মতো অসংখ্য পাঠক প্রতি সপ্তাহে অপেক্ষা করতেন তার লেখার জন্য। তার ভাষা ছিল সহজ; কিন্তু ভাবনা ছিল গভীর। রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কট নিয়ে তিনি যখন লিখতেন, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট দলীয় অবস্থান থেকে লেখা হতো না; বরং তার লেখায় থাকত এক ধরনের ঐতিহাসিক দূরত্ব- যেন তিনি বর্তমানকে দেখছেন ভবিষ্যতের চোখ দিয়ে। এই গুণ খুব কম লেখকের মধ্যে দেখা যায়।
২০১৫ সালের সেই কালরাত্রির কথা মনে হলে আজও বুক কেঁপে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপনকে আজিজ সুপার মার্কেটে উগ্রবাদীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। আমি জানি, সেই আঘাত তাকে ভেতর থেকে কতটা বিধ্বস্ত করেছিল। কিন্তু বাইরে তিনি সেই একই স্থৈর্য বজায় রেখেছিলেন। এক পিতার মুখে যে কথা শোনা যায় না, তেমন এক কথা তিনি সেদিন বলেছিলেন, সন্তানকে জাতির কল্যাণে উৎসর্গ করার কথা। এই আত্মত্যাগের ভাষা আমি আর কারো মুখে শুনিনি। এই ঘটনার পরও তিনি লেখা থামাননি, চিন্তা থামাননি; বরং আরো গভীরভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরের সহিংসতা, ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন।
জীবনের শেষ পর্বে, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন প্রায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও, কারণ তিনি সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক পদ-পদবির প্রতি উদাসীন ছিলেন। কিন্তু আমি জানি, এই দায়িত্বকে তিনি দেখেছিলেন, বাংলা একাডেমিকে আবার তার মূল চরিত্রে, অর্থাৎ ভাষা ও সাহিত্যের নিরপেক্ষ পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবে।
২০২৬ সালের ৫ জুলাই, তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন। তাকে দ্রুত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নেয়া হয়। বেলা আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খবরটি যখন আমার কাছে পৌঁছাল, মনে হলো, দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের একটি স্তম্ভ ভেঙে পড়ল।
তার মৃত্যু সংবাদে সারা দেশে শোকের ছায়া নামে। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী নিজে তার বাসভবনে গিয়ে শোক জানান, স্মরণ করেন তার শিক্ষকতার কথা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গনের বহু মানুষ শোক জানান।
সোমবার সকালে তার লাশ প্রথমে নেয়া হয় বাংলা একাডেমিতে, এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। সর্বস্তরেরর মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত করা হয়।
আমার জীবনের একটি বড় অধ্যায় জুড়ে ছিলেন এই মানুষটি। তিনি আমাকে শুধু জ্ঞান দেননি, দিয়েছেন এক ধরনের জীবনদর্শন। কিভাবে ক্ষমতার কাছে না গিয়েও সমাজে প্রভাব রাখা যায়, কিভাবে ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেও নীতির প্রশ্নে আপস না করা যায়, এসব আমি শিখেছি তার কাছ থেকেই। যে বইটি আমি তাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম, তা এখন আরো গভীর এক শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে থাকবে- এক প্রয়াত শিক্ষকের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত।
আবুল কাশেম ফজলুল হক আর নেই; কিন্তু তার রেখে যাওয়া অর্ধশতাধিক গ্রন্থ, তার সম্পাদিত ‘লোকায়ত’, তার শিক্ষকতার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী, আর সবচেয়ে বড় কথা- তার নীতিনিষ্ঠ জীবনযাপনের দৃষ্টান্ত, এসব দীর্ঘকাল আমাদের সামনে থাকবে। তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন, যে প্রতিষ্ঠান কোনো দলিল বা সনদ ছাড়াই টিকে থাকবে, কারণ তা গড়ে উঠেছিল সততা, সাহস আর নিরলস চিন্তার ওপর।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়