বিশ্বরাজনীতিতে কিছু যুদ্ধ শুধু সীমান্ত পরিবর্তন করে না; বদলে দেয় ইতিহাসের গতিপথও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সূচনা করেছিল; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, আজ তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাত সেই প্রশ্ন আরো তীব্র করেছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। বহু বছর ধরে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে চলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথমবারের মতো খোলাখুলি সংঘর্ষের রূপ নেয়। পরে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত করলেও মূল সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান আসেনি; বরং স্পষ্ট হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য এখন শুধু আঞ্চলিক সঙ্কটের কেন্দ্র নয়; এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষাগার।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য সমকালীন বিশ্বের দুই বিপরীতমুখী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আলেক্সান্ডার ডুগিন এবং ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। একজন মনে করেন, এই সঙ্ঘাত পশ্চিমা আধিপত্যের পতনের সূচনা। অন্যজনের মতে, এটি উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বই আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক বিতর্ক।
ডুগিন : ভূরাজনীতির কেন্দ্রে সভ্যতার প্রত্যাবর্তন
ডুগিনকে অনেকেই শুধু রুশ জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে দেখেন। কিন্তু তার দর্শনের মূল ভিত্তি আরো বিস্তৃত। তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চালিকাশক্তি রাষ্ট্র নয়; বরং সভ্যতা। পশ্চিমা উদারনৈতিক বিশ্ব একটি সভ্যতা, ইসলাম আরেকটি, রুশ-ইউরেশীয় জগৎ আরেকটি, আবার চীনা সভ্যতাও স্বতন্ত্র শক্তি।
তার মতে, স্নায়ুযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেল ইউনিভার্সালিজম’ নামে একটি একক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মডেল পুরো বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাজার অর্থনীতি কিংবা বিশ্বায়নের মতো ধারণাগুলোকে তিনি কেবল মূল্যবোধ হিসেবে নয়; বরং পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উপকরণ হিসেবেও দেখেন। এই কারণেই ডুগিনের কাছে ইরান বিশেষ গুরুত্ববহ। তার মতে, ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এমন এক ইসলামী সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে, যা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
ডুগিনের বিশ্লেষণে ইরান, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা নয়; বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের ভিত্তি। তার ভাষায়, ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ফলে তেল আবিবের নিরাপত্তা তার কাছে শুধু একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়; বরং পুরো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রভাব রক্ষার প্রশ্ন।
তার মতে, যদি ইরান পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়, তাহলে বিশ্বে এমন বার্তা যাবে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো এককভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রক নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার টিকে থাকা, ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব- এসব ঘটনাকে ডুগিন একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ফুকুয়ামা : সঙ্কটে উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা
ডুগিন যেখানে সভ্যতার সঙ্ঘাত দেখেন, সেখানে ফুকুয়ামা দেখেন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, উদারনৈতিক গণতন্ত্র মানবজাতির রাজনৈতিক বিকাশের সবচেয়ে সফল মডেল। যদিও পরে তিনি স্বীকার করেন, ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি, তবুও এখনো তার বিশ্বাস- আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
ফুকুয়ামার বিশ্লেষণে ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বিস্তার করে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে তার অবস্থানকে একপক্ষীয় বলা যাবে না। তিনি বহুবার সতর্ক করেছেন, গাজা যুদ্ধ, বেসামরিক হতাহত এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ অতি-ডানপন্থী রাজনীতির কারণে পশ্চিমা বিশ্ব নিজের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার মতে, যদি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রবক্তা রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন উপেক্ষা করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হবে।
বাস্তবতা কি ডুগিনকে সমর্থন করছে?
এখানেই বিতর্ক সবচেয়ে আকর্ষণীয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি, নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং ইসরাইলকে দেয়া নিরাপত্তাসহায়তা দেখায় যে ওয়াশিংটনের প্রভাব এখনো অটুট। অন্য দিকে এটাও সত্য, বর্তমান বিশ্ব আর ১৯৯৫ সালের মতো নয়।
চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ব্রিকস সম্প্রসারিত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো একযোগে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং মস্কোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
ফলে বাস্তবতা এমন এক বিশ্বকে নির্দেশ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও একমাত্র শক্তি নয়। এই পরিবর্তনই ডুগিনের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতকে ডুগিন দেখেন পশ্চিমা এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের উত্থান হিসেবে; অন্য দিকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এটিকে উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ওপর কর্তৃত্ববাদী শক্তির চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ২০২৬ সালের বাস্তবতা কার বিশ্লেষণকে বেশি সমর্থন করছে? উত্তরটি সরল নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আর স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের মতো দ্বিমাত্রিক নয়। বর্তমান বিশ্বে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক- সবকিছু মিলেই একটি নতুন শক্তির মানচিত্র তৈরি করছে।
বহু মেরুকেন্দ্রিকতা কি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
ডুগিনের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য শেষের পথে। গত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ এই যুক্তি পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ দেয় না।
ব্রিকস এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থাপত্য গঠনের আকাক্সক্ষাও প্রকাশ করছে। নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জোটটির ভৌগোলিক ও জ্বালানি-ভিত্তিক গুরুত্ব বেড়েছে।
একই সাথে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ইউরেশীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া ও চীন এই প্ল্যাটফর্মকে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর বিকল্প হিসেবে শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
অন্য দিকে পশ্চিমা জোটও দুর্বল হয়ে পড়েনি। ন্যাটো ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরো সংহত হয়েছে। ইউরোপ প্রতিরক্ষাব্যয় বাড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সাথে সামরিক সমন্বয়ও জোরদার করেছে। ফলে ডুগিন যে দ্রুত পশ্চিমা ব্যবস্থার পতনের পূর্বাভাস দেন, বাস্তবতা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি।
অর্থাৎ বিশ্বে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটছে, কিন্তু তা এখনো পূর্ণাঙ্গ বহু মেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনীতি
এই সঙ্ঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন আর একক কোনো পরাশক্তির ছায়ায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না।
সৌদি আরব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলেও অর্থনীতি ও বিনিয়োগে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। একইভাবে ইরানের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ দেখিয়েছে।
তুরস্ক এক দিকে ন্যাটোর সদস্য, অন্য দিকে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের সাথে সমান্তরাল যোগাযোগ বজায় রেখে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
কাতার দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক মধ্যস্থতার ভূমিকায় রয়েছে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রতি নমনীয় মনে হলেও দেশটি অর্থনৈতিক কূটনীতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও ইউরোপ- সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে।
এই প্রবণতা দেখায়, ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো এখন ‘একটি জোটে আবদ্ধ’ থাকার বদলে ‘বহুমুখী অংশীদারত্বে’র কৌশল গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় স্ট্র্যাটেজিক হেজিং- অর্থাৎ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা।
ফুকুয়ামার উদ্বেগ অমূলক কি না সে প্রশ্নও আসতে পারে। এটি হয়তো একেবারেই নয়। তিনি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, তা হলো- আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এক দিকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির কথা বলা হয়, অন্য দিকে একই সময়ে সামরিক অভিযান, নিষেধাজ্ঞা, সাইবার আক্রমণ এবং ড্রোন যুদ্ধ ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এর ফলে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ফুকুয়ামার আশঙ্কা হলো, যদি আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে, তাহলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
ডুগিন না ফুকুয়ামা- কার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হচ্ছে
সম্ভবত দু’জনের কেউই পুরোপুরি সঠিক নন, আবার পুরোপুরি ভুলও নন। ডুগিন ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন, এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। চীনের উত্থান, রাশিয়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা, ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বায়ত্তশাসিত কূটনীতি তার বিশ্লেষণকে আংশিকভাবে সমর্থন করে।
অন্য দিকে ফুকুয়ামাও ভুল প্রমাণিত হননি। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান- এসবের গুরুত্ব এখনো অস্বীকার করা যায় না; বরং যখনই এসব দুর্বল হয়েছে, তখনই সঙ্ঘাত ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
বাস্তবতা হলো, বিশ্ব এখন একটি ‘সংক্রমণ পর্যায়ে’ রয়েছে। এক দিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি; অন্য দিকে চীন অর্থনীতিতে, রাশিয়া নিরাপত্তা রাজনীতিতে, ভারত জনমিতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলো জ্বালানি ও বিনিয়োগে নতুন ভূমিকা গ্রহণ করছে।
অর্থাৎ একক আধিপত্যের যুগ ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে; কিন্তু তার জায়গায় কোন ধরনের নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে- সেই উত্তর এখনো নির্ধারিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় কী
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল, বাণিজ্যনির্ভর এবং জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এই সঙ্ঘাতের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জ্বালানির দাম, শিপিং ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রফতানি বাজারের বড় অংশ পশ্চিমা বিশ্বে হলেও অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন, জাপান, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং অন্যান্য অংশীদারের গুরুত্বও বাড়ছে।
তৃতীয়ত, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা। কোনো একক ভূ-রাজনৈতিক ব্লকের সাথে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের কৌশলগত নমনীয়তা সীমিত করতে পারে।
এই বাস্তবতায় ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’-নীতিটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বাস্তব কূটনৈতিক প্রয়োজন।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত