সাঈদ বারী
একজন মানুষের মূল্যায়ন কেবল তার পদ-পদবি, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় কিংবা প্রাপ্ত পুরস্কার দিয়ে করা যায় না। কিছু মানুষ তাদের সময়কে অতিক্রম করেন চিন্তার শক্তিতে, নৈতিক দৃঢ়তায় এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তারা বেঁচে থাকেন বইয়ের পাতায়, শ্রেণিকক্ষে, গবেষণার টেবিলে এবং পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তায়। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তেমন মানুষ। তার মৃত্যুতে হারিয়েছি এমন একজন বুদ্ধিজীবীকে, যিনি দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে নিরলস চিন্তা করেছেন। সেই চিন্তা তুলে ধরেছেন লেখালেখি ও বক্তৃতার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তার প্রস্থান অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ তিনি ছিলেন জ্ঞানের সামাজিক দায়িত্বে বিশ্বাসী। মনে করতেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ শুধু গবেষণা নয়, সমাজকে ভাবতে শেখানো; মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনা এবং সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা সৃষ্টি করা।

আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রচারের চেয়ে প্রজ্ঞা, জনপ্রিয়তার চেয়ে অধ্যবসায় এবং ক্ষমতার নৈকট্যের চেয়ে নৈতিক স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখাই একজন বুদ্ধিজীবীর প্রধান পরিচয় এবং সমাজের প্রতি তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তার ছাত্রজীবন কেটেছে উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে। ছিলেন মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক ধারায় সম্পৃক্ত। ষাটের দশকের গণ-আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন সমাজবাস্তবতা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু মতবাদকে তিনি অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত করেননি। বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি; কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা, আশ্রয় এবং নানাভাবে সহায়তা দিয়েছেন। স্বাধীনতার পরও কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নেননি; স্বাধীন রাষ্ট্রকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার বৌদ্ধিক সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করে চার দশকেরও বেশি সময় তিনি শিক্ষা দান করেছেন। তার ক্লাস ছিল সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বোঝার ক্ষেত্র। কঠিন তাত্ত্বিক বিষয়ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন তিনি।

তার গ্রন্থগুলো বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মূল্যবান সম্পদ। ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’সহ তার অসংখ্য গ্রন্থে আমরা এক দিকে যেমন ইতিহাস ও সমাজের বিশ্লেষণ পাই, অন্য দিকে পাই আত্মসমালোচনার আহ্বান।

আজকের বাংলাদেশে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষের প্রয়োজন আরো বেশি। কারণ আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে; কিন্তু গভীর পাঠ কমেছে; মতামতের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক সঙ্কুচিত হয়েছে; মননশীল আলাপের পরিসর কমেছে। এই বাস্তবতায় তার জীবন ও কর্ম আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়; চিন্তার বিকাশে, গবেষণার প্রসারে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিহিত।

তিনি আমাদের আরো একটি শিক্ষা দিয়ে গেছেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার প্রশস্তি গাওয়া নয়, আবার অন্ধ বিরোধিতাও নয়। তার কাজ সত্যানুসন্ধান, যুক্তিকে সম্মান করা এবং সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করা।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তার রচনাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার চিন্তা নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। সমাজে যুক্তিনির্ভর, মানবিক ও মূল্যবোধভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ একজন চিন্তাবিদ তার মৃত্যুর পরও তার গ্রন্থ, তার ছাত্র এবং তার ধারণার মধ্য দিয়ে সমাজকে প্রভাবিত করতে থাকেন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার চিন্তা, তার লেখা, তার নৈতিক দৃঢ়তা এবং তার বৌদ্ধিক সততা বাংলাদেশের মননশীল সমাজে বহুদিন বেঁচে থাকবে। যে মানুষ নিজের জীবনকে সত্য, জ্ঞান ও মানবকল্যাণের অনুসন্ধানে উৎসর্গ করেন, তার মৃত্যু হয় না। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও তেমনই বেঁচে থাকবেন। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক