ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে দেখে অনেকে আশার বীজ বপন করেছিল। আশা ছিল— এই সরকার শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবে না; বরং রাষ্ট্র মেরামতের একটি বাস্তব পথ খুলে দেবে। ড. ইউনূসও জুলাই বিপ্লবের পর সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোকে, আলোচনার টেবিলে এনে জুলাই সনদের বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণও সেই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে।

তাই এখন প্রশ্ন আর নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেয়ার নয়। প্রশ্ন হলো— জনগণের সেই রায় বাস্তবে রূপ নিচ্ছে কি না। জুলাই সনদ যদি থানার আচরণ বদলাতে না পারে, আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারে, নির্বাচনের মাঠকে সবার জন্য সমান করতে না পারে, বাজেটকে জনস্বার্থমুখী করতে না পারে— তাহলে ইতিহাস একদিন কঠিন প্রশ্ন করবে : এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত আশা— শেষ পর্যন্ত কি শুধু ক্ষমতার দরজা বদলানোর জন্যই ছিল?

সনদটা ধীরে ধীরে সংসদ আর টকশোর ভাষায় বন্দী হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের কৃষক, শহরের রিকশাচালক, প্রবাসী শ্রমিকের পরিবার— তাদের কাছে এই শব্দটা এখনো বিমূর্ত। তাদের একটাই প্রশ্ন : আমার জীবনে কী বদলাবে? থানায় গেলে কি সঠিক আচরণ পাবো? মামলা কি বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? ভোট দিলে কি সেটি সঠিকভাবে গণনা হবে? ঘুষ ছাড়া কি সরকারি কাজ হবে? গুমের ভয় কি সত্যিই শেষ হয়েছে?

‘আমরা অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব—’ এ ধরনের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সরকারকে একটি লাইভ, অনলাইন ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালু করতে হবে, যেখানে প্রতিটি প্রতিশ্রুতির পাশে লেখা থাকবে : সম্পন্ন, প্রক্রিয়াধীন, নাকি আটকে আছে। আর আটকে থাকলে কার কাছে, কেন, কত দিন ধরে— সেটিও জনগণ জানতে পারবে।

এস্তোনিয়ার সরকার যেমন-২০২৩-২৭ মেয়াদের চার বছরের কর্মপরিকল্পনায় ৪৯৭টি নির্দিষ্ট কাজ চিহ্নিত করে সেগুলো মাসিকভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছে এবং বছর শেষে সম্পন্ন কাজের সারসংক্ষেপ প্রকাশের কথা বলেছে, ইউক্রেনও যুদ্ধের মধ্যেই ‘সংস্কার অগ্রগতি-সূচক’-এর মাধ্যমে সংস্কারের শর্ত, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও বাস্তবায়ন-অবস্থা অনলাইনের উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ডে তুলে ধরছে।

তাহলে বাংলাদেশের জুলাই সনদের ক্ষেত্রে কেন প্রতিটি প্রতিশ্রুতির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন-অবস্থা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে না?

জবাবদিহি তখনই কাজ করে, যখন মানুষ নিজের চোখে অগ্রগতি বা স্থবিরতা দেখতে পারে।

সরকার নিজের কাজের মূল্যায়ন নিজে করবে— এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। দরকার সুশীলসমাজ, বিচার বিভাগ, ছাত্র প্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন বাস্তবায়ন-পর্যবেক্ষণ কমিশন, যাদের প্রতি তিন মাসে একটি পাবলিক রিপোর্ট প্রকাশের ম্যান্ডেট থাকবে।

এই কমিশন সরকারের অধীনস্থ কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি হলে চলবে না। তাকে সংসদের কাছে জবাবদিহিমূলক, তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতাসম্পন্ন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে সক্ষম হতে হবে। জনগণকে জানতে হবে— কোন সংস্কার এগোচ্ছে, কোনটি আটকে আছে, আর কার কারণে আটকে আছে।

‘আমরা পুলিশ সংস্কার করব’— এটি একটি বাক্য, প্রতিশ্রুতি নয়। প্রতিশ্রুতি তখনই প্রতিশ্রুতি হয়, যখন তার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে।

প্রতিটি বড় সংস্কার প্রস্তাবের সাথে সংসদে উত্থাপনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। সেই সময়সীমা মিস হলে জাতির কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে— নীরবতা নয়। কারণ সংস্কার বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় শত্রু সব সময় বিরোধিতা নয়; অনেক সময় তা হয় অনির্দিষ্ট বিলম্ব।

জুলাইয়ের বিচার তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাক্ষী নিরাপদ বোধ করবে সাক্ষ্য দিতে। এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার— আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি চাই না। বিচার কোনো প্রতিহিংসার হাতিয়ার হতে পারে না। তাড়াহুড়ো করে বিচার করলে ন্যায়বিচার চাপা পড়ে যেতে পারে; কিন্তু দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও বিচার যদি দৃশ্যমান পথে না এগোয়, তাহলে সেটিও ন্যায়বিচারের অস্বীকার।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বাস্তব সক্ষমতাও জরুরি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের প্রয়োজনীয় যানবাহন ও লজিস্টিক সহায়তা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে— যা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। এমন সংবেদনশীল বিচারে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে দুর্বল রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না। সরকারের উচিত ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে প্রয়োজনীয় জনবল, যানবাহন, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও বাজেট দিয়ে আরো গতিশীল ও দক্ষ করে তোলা।

ইউনিয়ন পরিষদ, মসজিদ, স্কুল, শ্রমিক সংগঠন ও প্রবাসী কমিউনিটিতে সহজ ভাষায়, সংক্ষিপ্ত লিফলেট ও স্থানীয় ভাষায় ভিডিওর মাধ্যমে সনদের বার্তা পৌঁছাতে হবে। যেটা মানুষ বোঝে না, সেটা মানুষ রক্ষাও করে না।

গণভোটে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে— প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে সনদ অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু রায়ের পর যা হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো গঠনের কথা ছিল; প্রথম অধিবেশনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার কথাও বলা হয়েছিল। অথচ সেই কাঠামো গঠনই এখনো অনিশ্চিত— দ্বিতীয়বার শপথ নিয়ে দ্বিধা, আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, আর সংসদের ভেতরেই সনদকে ঘিরে বিতর্ক।

সরকার মুখে বলছে, তারা সনদ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। কিন্তু ‘পথে হাঁটছি’ বলাটা প্রমাণ নয়— প্রমাণ হলো দৃশ্যমান পদক্ষেপ। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কোন কমিটি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কাঠামো কাজ করছে, তাদের প্রথম বৈঠক কবে হয়েছে বা কবে হবে, কোন কোন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, আর কোথায় কাজ আটকে আছে— এসবের কোনো স্পষ্ট জবাব নেই।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দেরি যত দীর্ঘ হবে, সনদ ততই একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে ভুলে যাওয়া অতীতে পরিণত হবে। যে রাজনৈতিক দল আজ ক্ষমতায় থেকে দেরি করছে, আগামী নির্বাচনে সেই দলকেই এই দেরির জবাব দিতে হবে— এই বার্তাটা এখনই জনগণের সামনে স্পষ্ট করে আনতে হবে। ইতিহাস বলে, যে সংস্কার একবার পিছিয়ে যায়, তা প্রায় কখনোই নিজে থেকে আবার গতি পায় না। তাকে গতি দিতে হয় জনগণের চাপ, নাগরিক নজরদারি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মাধ্যমে।

তাই জনগণের কাছে এখনকার আহ্বান স্পষ্ট: প্রশ্ন করা বন্ধ করবেন না। বাস্তবায়ন কাঠামো কবে বসছে, জিজ্ঞেস করুন। প্রতিনিধিকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি শপথ নিয়েছেন কি না; না নিলে কেন নেননি। সাংবাদিক, নাগরিক সংগঠন, ছাত্র প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এই প্রশ্নগুলো বারবার তোলা— সংসদে, সংবাদমাধ্যমে, জনসভায়, রাস্তায়। কারণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলাটা ছিল প্রথম ধাপ। বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাটা দ্বিতীয় এবং কঠিনতর ধাপ। আর সেই ধাপে জনগণের নজরদারিই একমাত্র নিশ্চয়তা।

অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া এসবের কিছুই টেকে না। জুলাইয়ের পেছনে ছিল বেকারত্ব, বৈষম্য, দুর্নীতি আর সুযোগের অভাব। বাজেটে যদি কর্মসংস্থান, প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন অগ্রাধিকার না পায়, তাহলে জুলাইয়ের সাম্যের প্রতিশ্রুতি একটি ফাঁকা স্লোগানে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ এখন আশা আর অধৈর্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। যারা চোখ হারিয়েছে, যারা রক্ত দিয়েছে, যারা সন্তান হারিয়েছে— তারা শুধু ক্ষমতা বদলের জন্য তা দেয়নি। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে সত্য বলার জন্য শাস্তি হয় না; ভোট দেয়ার জন্য ভয় পেতে হয় না; ন্যায় চাইতে গেলে দরজায় দরজায় অপমানিত হতে হয় না।

তাই আজকের প্রশ্নটা সহজ : জুলাই সনদ কি একটি দলীয় নথি হয়ে থাকবে, নাকি জনগণের সাথে রাষ্ট্রের একটি বাস্তব চুক্তি হয়ে উঠবে?

লেখক : কানাডা প্রবাসী অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক