ব্যাংক লুটেরাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রির দাবি

আমানতকারীদের টাকা সুদসহ ফেরত দেয়া হবে, ‘হেয়ার কাট’ থাকবে না- অর্থমন্ত্রী : এস আলম বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা, অরিয়ন ও সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু

Printed Edition
first-1
ব্যাংক লুটেরাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রির দাবি

সংসদ প্রতিবেদক

ব্যাংকিং খাতের চরম অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের জমানো টাকা দ্রুত ফেরত নিশ্চিত করতে ব্যাংক ‘লুটেরা’ ও ‘ব্যাংকখেকো’ মালিকদের কঠোর শাস্তি এবং তাদের সব সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করার জোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে।

সংসদে উত্থাপিত এ দাবির জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সঙ্কটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সম্পূর্ণ আমানত সুদসহ ফেরত দেয়া হবে। আমানতকারীদের জন্য কোনো ধরনের ‘হেয়ার কাট’ (আমানতের অর্থ কর্তন) প্রযোজ্য হবে না। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি সংসদকে জানান এবং দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

গতকাল বুধবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২১তম দিনে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১-এর আওতায় ‘জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ’-এর মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

এমপি রেহানা আক্তার রানুর মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ

মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘দেশের কয়েকটি ব্যাংকের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থপাচারের কারণে আজ লাখ লাখ আমানতকারী নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে পারছেন না। এই টাকা কোনো বিলাসিতার টাকা নয়। এটা একজন বাবার মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, একজন মায়ের চিকিৎসার শেষ ভরসা, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের টিউশন ফি, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর টিকে থাকার মূলধন, কিংবা কারো সারা জীবনের জমানো সঞ্চয় বা পেনশনের টাকা। ব্যাংক হচ্ছে মানুষের গভীর আস্থার জায়গা; ব্যাংক থেকেই যদি টাকা লুট হয়ে যায়, তবে মানুষ কোথায় যাবে? মানুষ ব্যাংকে টাকা না রাখলে দেশে বিনিয়োগ কমে যাবে, অর্থের প্রবাহ থমকে দাঁড়াবে এবং পুরো অর্থনীতি চরম সঙ্কটে পড়বে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, বর্তমানে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছেন না। সময়মতো চিকিৎসা করাতে না পেরে অনেকে মৃত্যুবরণও করছেন। অন্য দিকে, লুটেরা মালিকপক্ষ বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারের দিকে আশার চোখে তাকিয়ে আছে এবং তাদের এই করুণ আর্তনাদ ও কান্নার প্রতিকারে রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার দাবি করছে।

রেহানা আক্তার রানু এসব লুটেরা ও ব্যাংকখেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সমুদয় সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা দ্রুত ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

অর্থমন্ত্রীর জবাব ও ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬’

নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং একটি নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে কোনোভাবেই নীরব ভূমিকা পালন করতে পারে না। সরকার দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত এই আর্থিক খাতকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি সুসংগঠিত বহুমাত্রিক ‘রেজুলিউশন কাঠামো’ প্রতিষ্ঠা করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন আইনি কাঠামো: এই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় মারাত্মক সঙ্কটে পড়া পাঁচটি ব্যাংক- এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিকে একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ‘ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এটি সরকারের রেজুলিউশন কৌশলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

এই একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নবগঠিত নতুন ব্যাংকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। ‘আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এর মাধ্যমে আমানত সুরক্ষা তহবিলের অধীনে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির আইনি অধিকার আগে যেখানে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা ছিল, তা বাড়িয়ে দুই লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিলেন না, কিন্তু বর্তমান সরকার তাদেরও এই আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজুলিউশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের জমানো অর্থ ফেরত পাচ্ছেন।

সম্পদ উদ্ধার ও পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ

অর্থমন্ত্রী জানান, এই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মের সাথে জড়িত দায়ীদের চিহ্নিত করতে একটি বিশেষ ‘ফরেন্সিক অডিট’ চলমান রয়েছে। এই অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬’-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী, রেজুলিউশনের আওতাধীন ব্যাংকের পাওনা আদায়ে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি, ব্যাংক তহবিল থেকে অর্জিত আয় বা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও তা বিক্রির পূর্ণ ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেয়া হয়েছে।

ফৌজদারি (ক্রিমিনাল) মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি (সিভিল) আইন অনুসরণের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক একটি ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ৯টি আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ (অর্থ উদ্ধার হলেই কেবল ফি প্রদান) শর্তে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ছয়টি হাইপ্রোফাইল কেস- সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা এবং অরিয়ন গ্রুপ- এর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, বিষয়গুলো তিনি সংসদে একাধিকবার বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করায় তার বক্তব্যের এই লিখিত অংশটি পঠিত বলে গণ্য করার জন্য স্পিকারকে অনুরোধ জানান।

এমপি রানুর সম্পূরক প্রশ্ন: ‘হেয়ার কাট’ ও ‘ডিম থেরাপি’

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় রেহানা আক্তার রানু বলেন, চট্টগ্রামের অর্থমন্ত্রীর বাসার সামনে আমানতকারীরা মানববন্ধন করে তাদের করুণ আকুতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রাহকরা সঠিক জায়গাতেই পৌঁছাতে পেরেছেন।

পরবর্তীতে রানু বলেন, তিনি আজ সাধারণ ৭৫ লাখ গ্রাহকের প্রাণের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন: ‘এক দিকে মানুষ টাকা তোলার চিন্তায় দিশেহারা, অন্য দিকে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘হেয়ার কাট’ নামক এক মরণকাট সমস্যা। এটি যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা! ব্যাংক ডাকাতদের ডাকাতির দায়ভার কেন নিরীহ আমানতকারীরা বহন করবেন? আমানতকারীদের একমাত্র অপরাধ ছিল- তারা বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন। তাই আমার স্পষ্ট দাবি, ‘হেয়ার কাট’ নামক এই মরণকাট প্রস্তাবটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করতেই হবে।’

সংসদ সদস্য রানু আরো যোগ করেন, যেসব ব্যাংক ডাকাত আমানতকারীদের টাকা লুট করেছে তাদের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। তারা পৃথিবীর যেখানেই পালিয়ে থাকুক না কেন, তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ডিম থেরাপি’ দিয়ে লুণ্ঠিত টাকা আদায় করতে হবে। একই সাথে তিনি মন্ত্রীর কাছে জানতে চান- ‘হেয়ার কাট’ প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তার মন্ত্রণালয়ের আছে কি না।

অর্থমন্ত্রীর আশ্বাস : ‘আমানত সুদসহ ফেরত দেয়া হবে, হেয়ার কাট থাকবে না’

সংসদ সদস্য রানুর ঝাঁজালো বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বক্তব্যে এক ধরনের কড়া সতর্কবার্তা (ওয়ার্নিং) ফুটে উঠেছে। তবে সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত সহানুভূতি ও গুরুত্বের সাথেই দেখছে।

আমানতকারীদের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবার আশ্বস্ত করে বলেন, গ্রাহকদের জমা রাখা আসল টাকা এবং তার ওপর অর্জিত সুদ পুরোটাই ফেরত দেয়া হবে। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, আমানতকারীদের অর্থের ওপর কোনো ‘হেয়ার কাট’ থাকবে না। আমানত কাটছাঁটের প্রশ্নই ওঠে না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকগুলো বর্তমানে বেশ লোকসানের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। একটি লোকসানি ব্যাংক যেখানে আসল টাকাই ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে সুদসহ টাকা দেয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং- তা অনুধাবন করতে হবে। তা সত্ত্বেও, একটি দায়িত্বশীল নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সব টাকা ফেরত দেয়া হবে।

পরিশেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি চিকিৎসাসেবা কিংবা মেয়ের বিয়ের মতো জরুরি প্রয়োজনে মানুষের অপেক্ষা করার মতো সময় থাকে না। আমি প্রতিনিয়ত এই করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। তবে এই সঙ্কটের সমাধান মূলত একটি মধ্যমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমি নিশ্চিতভাবে আবার বলছি- আমানতকারীরা তাদের পুরো টাকা সুদসহ ফেরত পাবেন। এর জন্য সবাইকে কিছুটা সময় ও ধৈর্য ধরতে হবে।’