সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
ইইউসহ ৮ দেশের সাথে চলছে বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষি
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি ভারতের সাথে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) এবং জাপান, চীন, দণি কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। একই সাথে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর এবং নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো: আবুল কালাম, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মাহবুবুর রহমান এবং সংরতি মহিলা আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার পৃথক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকসহ রফতানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার, সহজ ‘রুলস অব অরিজিন’ এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তৈরী পোশাকসহ অন্যান্য রফতানি খাতের জন্য অনুকূল ‘রুলস অব অরিজিন’, শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখতে ইইউ ও যুক্তরাজ্যের সাথে আলোচনা চলছে।
তিনি জানান, ইইউর জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩২টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে ইইউর সাথে নিবিড় যোগাযোগ রা করা হচ্ছে।
ভারতের সাথে সেপা
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং বাংলাদেশের রফতানি বাড়াতে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা/সিইপিএ) স্বারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও ভারত পণ্য, সেবা এবং বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করে একটি সিইপিএর সম্ভাব্যতা সমীা পরিচালনায় সম্মত হয়। যৌথ সমীার সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ বৈঠকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি উভয় দেশ প্রয়োজনীয় বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করেছে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে অভ্যন্তরীণ শিল্পের বিকাশ, আমদানি-বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে উৎসাহ দেয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
২০২ দেশে ৮১২ পণ্য রফতানি
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি দেশে ৮১২ ধরনের পণ্য রফতানি করেছে। এসব পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৪৪ হাজার ১৬৭ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রফতানি আয়ের ৯১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, ভারত, ইতালি, কানাডা, জাপান, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, বেলজিয়াম, চীন, তুরস্ক, দণি কোরিয়া, মেক্সিকো ও রাশিয়া।
রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরী পোশাক (ওভেন ও নিট), হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত ও জীবিত মাছ, কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা এবং প্রকৌশলজাত পণ্য।
সার্কেও বাণিজ্য সম্প্রসারণ
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বাড়াতে শুল্ক বহির্ভূত বাধা দূর, সংবেদনশীল পণ্যের তালিকা কমানো, শুল্ক হ্রাস এবং দ্বিপীয় বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সচিব ও ওয়ার্কিং গ্রুপপর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সাথে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ভুটানের সাথে গত ৯-১০ মার্চ অনুষ্ঠিত বাণিজ্য সচিবপর্যায়ের বৈঠকে দ্বিপীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই বাংলাদেশ-ভুটান অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যৌথ বাণিজ্য কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা পিটিএ নিয়ে তিন দফা আলোচনা শেষ করেছে এবং চতুর্থ দফা বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। নেপালের সাথেও পিটিএ বিষয়ে তিন দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং পরবর্তী বৈঠকের জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সাফটা প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে সার্কভুক্ত দেশগুলো ২০১২ সাল থেকে সংবেদনশীল পণ্যের তালিকা ২০ শতাংশ কমিয়েছে এবং বর্তমানে তৃতীয় ধাপে এ তালিকা আরো কমানোর কাজ চলছে। ভারত বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত এলডিসি দেশগুলোর প্রায় সব পণ্যের জন্য তামাক ও মাদকজাত পণ্য ছাড়া শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে।
তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ-ভুটান অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বর্তমানে বাংলাদেশের ১০০টি পণ্য ভুটানে এবং ভুটানের ৩৪টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে।