জুলাই ২০২৪। জাতির আশা-আকাক্সক্ষার স্বপ্ন উদ্দীপ্ত একটি মাস। এই মাসে জাতিসত্তার স্ফুরণ প্রত্যক্ষ করেছে পুরো জাতি। নিজেকে চেনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়ার স্বপ্নজাগানিয়া এই মাসে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা দেশের মানুষ একই চেতনার মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সত্য ও ন্যায়ের আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত হয়েছিল। যেন এক হ্যামিলনের বংশীবাদকের মায়াবী সুরে জেগে উঠেছিল দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। জনতার এমন জাগরণ, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এর আগে কেউ দেখেনি।
পুরনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং জাতীয় জীবনের সর্বত্র মেধার মূল্যায়ন, দুর্নীতির মূলোৎপাটন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে সৃষ্টি হয়েছিল এক নতুন চেতনার। জাতি লক্ষ করেছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকারের অধিষ্ঠান, সুবিচারের নিশ্চয়তা ও মেধার মূল্যায়নের আকাক্সক্ষার পথে এক নতুন অভিযাত্রা। অভিযাত্রার সাফল্যের সোপান রচিত হয়েছিল স্বৈরাচারের পতনে। মিথ্যার যে বাতাবরণে জাতিকে বন্দী রাখা হয়েছিল দেড় যুগ ধরে, মুহূর্তেই তা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। প্রমাণিত হয়, জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
জুলাই বিপ্লবের চেতনা ছিল জাতিসত্তার রূপান্তরের চেতনা। কিন্তু এ চেতনাকে সুকৌশলে খর্ব করা এবং জাতিকে আবারো বিভাজিত করার চেষ্টা প্রথম থেকেই লক্ষণীয়। প্রথমত জুলাইযোদ্ধাদের সন্ত্রাসী অভিধায় চিহ্নিত করার অপচেষ্টা হয়েছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একাংশের অতিকথন ছিল লক্ষণীয়। নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে এসব মিডিয়া হাউজ অত্যন্ত কৌশলে বিভাজনকামী চরিত্রগুলোর পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা এখন প্রকাশ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার দাবি তুলে জুলাই আন্দোলনকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিতে চাইছে। বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারদলীয় কিছু নেতাও এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছেন। জুলাই বিপ্লবের সাফল্য ধরে রাখার জন্য যা করা প্রয়োজন ছিল তা করতে না পারায় সমস্ত আন্দোলনকে অস্বীকারের অপচেষ্টা চলছে। যারা কোনোভাবেই জুলাই আন্দোলনের কুশীলব ছিলেন না এবং ঘোষণা দিয়ে দূরে থেকেছেন তারা আজ এ আন্দোলনের রূপকার হিসেবে নিজেদের জাহির করছেন।
জুলাই বিপ্লবের উত্তরণের পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। শুরু থেকেই এই লড়াইর গতিমুখ বেপথ- করার চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্র তৈরি ও এর স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। জুলাই ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতি যে একটি প্রহসন এবং জাতির সাথে প্রতারণা ছিল তা পরবর্তী সময়ে নিজের মুখে স্বীকার করেছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। পরবর্তী চক্রান্ত ছিল নির্বাচন প্রভাবিত করার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী একজন উপদেষ্টার আত্মস্বীকৃতি এর প্রমাণ। জুলাই বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার, একে অস্বীকারের প্রবণতা দেখা গেছে নতুন সংসদের অধিবেশনেও। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় মেধার মূল্যায়ন রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থাÑ সব কিছুতেই অযাচিত অনাকাক্সিক্ষত সরব বিরোধিতা দেখা গেছে। নৈতিকতার চর্চা, গণতান্ত্রিক চেতনার আলোকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজগঠনের অভিযাত্রায় সংসদকে জাতি দেখতে চেয়েছিল অগ্রণী ভূমিকায়। জাতি হতাশ হয়েছে। জাতি লক্ষ করেছে, যে সংসদ জুলাই চেতনার ফসল, সেই সংসদেই খোদ জুলাইয়ের চেতনা অস্বীকার করার চেষ্টা চলছে। যার প্রমাণ স্বাধীন বিচারিক অবকাঠামোর জুলাই প্রস্তাব নিরেট সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করে দেয়া এবং দেশের অর্থ লুণ্ঠনকারীদের প্রত্যাবাসনের যৌক্তিকতা প্রদানের ঘৃণ্য প্রয়াস। নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত ও অশালীনভাবে একে অপরের চরিত্র হননের দৃশ্য জাতিকে হজম করতে হয়েছে। দেখতে হয়েছে, জাতীয় স্বপ্ন লালনের পরিবর্তে তা অস্বীকারের প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্র সংস্কারের জুলাই চেতনাকে পাঠানো হয়েছে হিমঘরে। ব্যক্তিবন্দনায় জাতির স্বপ্ন হারিয়ে গেছে জনগণের নির্বাচিত সংসদে। সংসদে ও বাইরে রেজিমেন্টাল দেশগঠনের কৌশল ইতোমধ্যে প্রতিভাত হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির মূলধারা রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে দেদার।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার, তরুণ সমাজকে শারীরিক, নৈতিক ও মানসিকভাবে ধ্বংসের মতো বিষয়ে সংসদের কার্যকর ভূমিকার অনুপস্থিতি জাতিকে আশাহত করছে। চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা শুনতে হয়েছে জাতিকে। জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশাগুলো এভাবেই একের পর এক বিসর্জিত হওয়ার পথে। হাজারো ছাত্র-জনতার চরম আত্মত্যাগ, নিগ্রহ ও অত্যাচারিত হওয়ার দুঃসহ ঘটনাবলি চাপা পড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে পরাজিত অপশক্তি যেভাবে প্রকাশ্যে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, তাতে দেশের মানুষ আতঙ্কিত।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ