মো: রাশেদুল হাসান আমিন

পূর্ব আফ্রিকার ছোট উপকূলীয় অঞ্চল সোমালিল্যান্ড দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও আজ পর্যন্ত মোগাদিসু বা আন্তর্জাতিক কোনো সরকার তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতা- যার মধ্যে আছেন পেনসিলভানিয়ার প্রতিনিধি স্কট পেরি, নর্থ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি প্যাট হ্যারিগান এবং সিনেটর টেড ক্রুজ, সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিল পেশ করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে এর নানা দিক উঠে এসেছে।

বিলটির মূল বক্তব্য হলো- ‘সোমালিল্যান্ড নামে পরিচিত এলাকার ওপর সোমালিয়া ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের সব দাবি অবৈধ ও অযৌক্তিক।’ এতে যুক্তরাষ্ট্রকে সোমালিল্যান্ডকে ‘একটি পৃথক, স্বাধীন দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে গণমাধ্যমে খবর আসে, ইসরাইল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সোমালিল্যান্ডে পুনর্বাসনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা করছে। সোমালিল্যান্ডের মানবাধিকারকর্মীরা এই পরিকল্পনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সতর্ক করেছেন, এটি শুধু নৈতিকভাবে ভুল নয়; বরং সোমালিল্যান্ডকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের গণহত্যায় অংশীদার করে তুলতে পারে। এ ছাড়া আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগে যারা সোমালিল্যান্ডের প্রতি সমর্থনশীল ছিলেন, তারা সম্ভবত তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন।

আগস্টের শুরুর দিকে হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা এখনই বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এটি আসলে খুব জটিলও বটে, তবে আমরা এখনই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’ তবে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। এরপর টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ ট্রাম্পকে চিঠি লিখে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান। ক্রুজের চিঠিতে বলা হয়, সোমালিল্যান্ড ‘ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে চেয়েছে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে সমর্থন জানিয়েছে।’ বিষটি প্রকাশ্যে আসার পর সোমালিয়ার রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রকে এই বলে সতর্ক করেন, সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতায় কোনো হস্তক্ষেপ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করবে এবং পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।

সোমালিল্যান্ড সরকার এখনো ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের বিষয়ে কিছু বলেনি, তবে তারা প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি ‘স্বাগত’। প্রেসিডেন্সির মুখপাত্র বলেছেন, ‘এই প্রতিষ্ঠিত সত্যের স্বীকৃতি দেয়া হবে কি না তা প্রশ্ন নয়; বরং কবে দেয়া হবে- সেটিই প্রশ্ন।’

রাজনৈতিক ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপট

সোমালিল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিয়ার অংশ হলেও কার্যত স্বায়ত্তশাসিত। এটি দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এবং জিবুতি ও ইথিওপিয়ার সাথে সীমান্ত ভাগাভাগি করে। এটি মূলত একটি ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্য ছিল, যখন সোমালিয়ার বাকি অংশ ছিল ইতালীয়; কিন্তু ১৯৬০ সালে সোমালিয়া স্বাধীনতা লাভের পর এই অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশটির সামরিক নেতা সিয়াদ বারেকে উৎখাত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বর্তমানে সোমালিল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। ২০০১ সালে সংবিধান অনুমোদনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়।

যদিও সোমালিল্যান্ডে গণতন্ত্র পুরোপুরি কার্যকর নয়, তা সত্তে¡ও বিরোধী নেতা আব্দিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি গত বছরের নির্বাচনে জিতেছেন এবং ক্ষমতার মসৃণ হস্তান্তর হয়েছে- এ ঘটনা কেবল পূর্ব আফ্রিকা নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও সহজলভ্য বিষয় নয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে সোমালিল্যান্ড অর্থনৈতিকভাবে ভুগছে, বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণে অযোগ্য। এ জন্য এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা থাকা সত্তে¡ও আর্থিক ও কূটনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধতা বজায় আছে।

স্বীকৃতি বনাম সশস্ত্র গোষ্ঠী : বিপর্যয়ের ঝুঁকি

সোমালিল্যান্ডে ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতি ঐতিহ্যগতভাবে গভীর সমর্থন আছে। স্থানীয়রা স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনায় আশাবাদী হলেও, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আওদাল প্রদেশের ৩৭ বছর বয়সী শিক্ষক আহমেদ দাহির সাবান বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের তাদের বরকতময় মাতৃভূমি থেকে জোর করে সরানো যাবে না। আমেরিকান ও ইসরাইলিরা যা করছে, তা হলো জাতিগত নিধন; আমরা সোমালিল্যান্ডে এর অংশ হতে চাই না।’ তিনি সতর্ক করেছেন, এতে আল-শাবাব ও দায়েশের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক জেথ্রো নরম্যান বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের কর্মসূচি, বিশেষত যদি এটি বহিরাগত চাপানো ও ইসরাইলি ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে এটি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের জন্য শক্তিশালী প্রচারণার হাতিয়ার হবে। তারা নিজেদেরকে সোমালি ঐক্য ও ফিলিস্তিনের মর্যাদার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।’

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হলে আল-শাবাব তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ফিলিস্তিনের সমর্থনে বিক্ষোভ আয়োজন করে। এ ছাড়া বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত সোমালিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও বিপুল জনসমাগম ঘটে।

শান্তি, কিন্তু কী মূল্যে?

সোমালিল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি অর্জনগুলো এসেছে ব্যয়সাপেক্ষে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে লাস আনোদে সরকারি বাহিনী বিক্ষোভকারী সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। এরপর ৯ মাস ধরে শহর অবরোধে থাকে; শত শত মানুষ নিহত হয়, দুই হাজার জন আহত হয়, দুই লাখ জন বাস্তুচ্যুত হয়। এটি প্রমাণ করে, সোমালিল্যান্ডে স্বীকৃতি লাভের পথে মানবাধিকার সঙ্কট এখনো বিদ্যমান।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, লাস আনোদে নির্বিচারে ঘরবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গোলা বর্ষণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ।

সোমালিল্যান্ড প্রশাসন আল-শাবাবের পর একমাত্র স্থানীয় সংগঠন হিসেবে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি ইসরাইলের সম্ভাব্য পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হারগেইসার মোহাম্মদ আওইল মাইগাগ বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক এখানে স্থানান্তর করা, প্রতিদানে স্বীকৃতি হোক বা অন্য কিছু, মূল্যবান নয়। আমরা মুসলিম ভাইদের রক্তের দায়ে জড়িত হবো।’

মার্কিন স্বার্থ ও কৌশলগত গুরুত্ব

সিনেটর ক্রুজের মতে, সোমালিল্যান্ড গালফ অব অ্যাডেনের ধারে এবং সরু বাব আল-মানদেব প্রণালীর পাশে অবস্থিত, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিপিং হয়। ইয়েমেনের ওপারে অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়। চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকায় সোমালিল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এর স্বাধীনতার দাবি তাইওয়ানের দাবির সাদৃশ্যপূর্ণ। তাইওয়ানের শীর্ষ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন রিপাবলিকান নেতারা চীনের প্রভাবের বিপরীতে অবস্থান নিতে চাইছেন।

আন্তর্জাতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতিতে আল-শাবাবের উগ্রপন্থা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে উগ্রপন্থা মোকাবেলায় পার্শ্ববর্তী অবস্থানে থাকতে হতে পারে। ওয়াশিংটন মোগাদিসুর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে, বিশেষত আল-শাবাবের কার্যক্রম সীমিত করার লক্ষ্যে। স্বীকৃতি দিলে সোমালিয়া রুষ্ট হতে পারে এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি এবং মার্কিন স্বার্থের কৌশলগত প্রয়োগের মধ্যে এক জটিল ও বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এক দিকে স্বীকৃতি দিলে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে, অন্য দিকে এতে উদ্বেগ, সন্ত্রাস ও অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জোরপূর্বক স্থানান্তরের পরিকল্পনা শুধু সোমালিল্যান্ড বা মার্কিন স্বার্থ নয়; বরং আন্তর্জাতিক শক্তির বৃহত্তর খেলা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামার আল-বুলুশি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে এমন চুক্তি আফ্রিকান নেতাদের স্বাধীনতার অভাবকে প্রতিফলিত করে, বিশেষ করে ঠিক তখনই যখন তারা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চাইছে।’ ‘প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার কমপক্ষে চারটি দেশের সাথে যোগাযোগ করছে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য, এমন প্রতিবেদনের মধ্যে ইসরাইলের চ্যানেল ১২ সম্প্রতি জানিয়েছে, সোমালিল্যান্ডের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় ‘অগ্রগতি’ হয়েছে।

অন্য দিকে গত ২ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি ক্রিস স্মিথ ও জন মুলেনার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে এক চিঠিতে বলেছেন, সোমালিল্যান্ড চীনের প্রভাব সীমিত করতে কৌশলগত অংশীদার এবং মার্কিন স্বার্থকে সমর্থন করছে। তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের দৃঢ় সমর্থনের মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। ডিআইআইএসের গবেষক নরম্যান বলেন, ‘যদি ট্রাম্প প্রশাসন সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়, তবে এটি সোমালিয়া ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে। ধোঁয়া থেকে খোলা অগ্নিতে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।’

সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি ও ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের পরিকল্পনা একটি জটিল এবং বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইস্যু। এক দিকে রয়েছে স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের আকাক্সক্ষা, অন্য দিকে রয়েছে মানবাধিকার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ইসলামী বিশ্বের প্রতি দায়বদ্ধতা। স্থানীয়রা মনে করেন, স্বীকৃতির বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তর কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই পদক্ষেপ শুধু সোমালিল্যান্ডের জন্য নয়, পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও স্থানীয় স্বার্থের মধ্যে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত সোমালিল্যান্ডের পথে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে।