আওয়ামী লীগের আমলে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই ছিল লুটপাট, দুর্নীতির উৎসব। রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের জন্যই বড় বড় প্রকল্প নেয়া হতো। কিভাবে কতটা লুটপাট হয়েছে রূপপুর পরমাণু প্রকল্পের বালিশকাণ্ড তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। সেই শাসকগোষ্ঠী এখন নেই; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পুরনো চরিত্র বদলায়নি। কাঠামোর ভেতর এখনো থেকে গেছে অপচয়ের মানসিকতা।
গতকাল নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পায়রা বন্দরকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে ২৬ পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরামর্শকদের পেছনে ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। পুরো প্রকল্পটি ১৭৫ কোটি টাকার। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১৫.৫ শতাংশ বরাদ্দই পরামর্শকের সম্মানী হিসেবে। একটি সফটওয়্যার ও আইসিটি অবকাঠামোভিত্তিক প্রকল্পে কেন ২৬ জন পরামর্শকের প্রয়োজন, সেটি অবশ্যই বড় প্রশ্ন। তা ছাড়া প্রতিজনের জন্য কেন এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে, তারও ব্যাখ্যা নেই।
প্রস্তাবে বলা আছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু সেমিনারই করতে হবে ৫০টি। এতে খরচ হবে ৮০ লাখ টাকা। প্রশিক্ষণে খরচ হবে তিন কোটি ৬১ লাখ টাকা।
এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ ও প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরে পর্যালোচনা করে ৫০টির পরিবর্তে পাঁচটি সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য আট লাখ টাকা রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একইভাবে অন্যান্য খাতেও প্রস্তাবিত ব্যয়ে বড় কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রস্তাবনা কিভাবে তোলা হলো?
এমন অতিরঞ্জিত ও অস্বাভাবিক প্রস্তাবনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর অন্তর্গত মানসিকতার ধারাবাহিকতা। কোনো প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের টেবিলে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দফতর এবং মূল্যায়ন কমিটির কয়েকটি স্তর পেরিয়ে যেতে হয়। এতগুলো প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করার পরও যদি এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার পরামর্শক ফি কিংবা অহেতুক ৫০টি সেমিনার আয়োজনের প্রস্তাব অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যাচাইয়ে গোলমাল ছিল।
পরিকল্পনা কমিশন এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ ছাঁটাই করেছে; কিন্তু কেবল কমিশনের ওপর নির্ভর করে এই অপচয় বন্ধ করা সম্ভব নয়। সবার আগে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি, কারা এই লাগামহীন বাজেট তৈরি করেছে। তাদেরকে অবশ্যই প্রশাসনিক জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। সেই সাথে প্রকল্পের কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ-পরামর্শক ফি নির্ধারণে নির্দিষ্ট ও হালনাগাদ স্ট্যান্ডার্ড কস্ট নির্দেশিকা চালুর বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।
পায়রা বন্দরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন। সক্ষমতা বাড়ানোর কাজের সময় কমিয়ে আনতে হবে। অটোমেশনও জরুরি। কিন্তু এই জরুরি কাজগুলোর অজুহাতে অর্থ নয়ছয় করার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্পের অর্থায়ন হবে সরকারের দেয়া ৪ শতাংশ সুদের ঋণে। সুতরাং ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাপবে সাধারণ জনগণের ঘাড়েই।
উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে আমাদের। পায়রা বন্দর প্রকল্পের এই প্রস্তাবনা পুনর্গঠন ভবিষ্যতে সব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।