সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সরকারি দল থেকে বলা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে আগের বিভিন্ন সংসদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হবে। অথচ এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগেই ঐকমত্য হয়েছিল। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ বা জুলাই সনদ স্বাক্ষর করে। সনদ অনুযায়ী, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হবেন বিরোধী দল থেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হবে। এ রীতি সংবিধানের বিধান হবে এমনও বলা ছিল; কিন্তু ক্ষমতায় বসে বিএনপি ওই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে আসছে বলে মনে হয়।
সংসদের কাজ আইনপ্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেয়া বা সুপারিশ করতে পারে। বিরোধী দলের সভাপতি থাকলে কমিটি সরকারের একক নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে। এ জন্য বিরোধী দল থেকে সভাপতি করার ধারণার উদ্ভব। কিন্তু সরকারি দল পেছন দিকে হাঁটছে। এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় গিয়ে তিন জোটের রূপরেখা এড়িয়ে যাওয়া বিএনপির জন্য শুভ ছিল।
বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের পাওয়ার কথা ১৪টি কমিটির সভাপতির পদ। তবে বিরোধী দল আশা করেছিল, সংসদের আসন সংখ্যানুপাতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আরো ১০টি কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার। এখন পর্যন্ত গঠিত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেয়া হয়েছে। সরকারি দল বলছে, আগামী অধিবেশনে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠনে আগের সংসদের রীতি অনুসরণ করবে। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম একটি দৈনিককে বলেছেন, অতীতের রীতি অনুযায়ী এবার সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে।
দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সমঝোতার নতুন রাজনীতি চালুর যে ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়, তা কার্যত এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ লক্ষণ শুধু সংসদে নয়, খোদ জুলাই বিপ্লবের গুরুত্ব খর্বেও স্পষ্ট। গণভোট নিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থান আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই সনদের সমঝোতা অনুযায়ী চারটি কমিটির সভাপতি অবশ্যই বিরোধী দল থেকে পাওয়ার কথা। এ ছাড়া সংখ্যানুপাতিক হিসাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলোর ২৬ শতাংশ বিরোধী দলের পাওয়া উচিত। এ জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই।
বর্তমান ব্যবস্থায় সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দিতে সরকার বাধ্য নয়। না দিলে কেউ চ্যালেঞ্জ করবেন না। কিন্তু চব্বিশের জন-আকাক্সক্ষার ভিত্তি সংবিধান নয়, জনগণের শক্তি। সেই আকাক্সক্ষার দালিলিক রূপান্তর জুলাই সনদ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে উপেক্ষা করা কঠিন নয়। যেখানে পতিত শেখ হাসিনা সরকার গোটা সংবিধানকেই আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিল।