মো: আবু বকর সিদ্দীক
ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ একটি। যেসব মুসলিম নারী-পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা ও আর্থিক সঙ্গতি আছে তাদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলমান। সর্বোচ্চসংখ্যক হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ পরিসংখ্যান থেকে এ দেশের মুসলমানদের হজ পালনের তীব্র আকাক্সক্ষা সহজে অনুমেয়। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানের এই তীব্র আকাক্সক্ষা অনুধাবন করে বর্তমান সরকার ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করেছে। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান যাতে যৌক্তিক খরচে হজ পালন করতে পারেন; সেই লক্ষ্যে সম্ভাব্য সবধরনের ব্যয় সঙ্কোচন করেছে।
হজের খরচ ও সরকারের ভূমিকা
হজের খরচ বাড়ানো বা কমানোয় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা রাখার সুযোগ খুব কম। হজের খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় সৌদিপ্রান্তে। এই খরচ সৌদি সরকার নির্ধারিত। তা সব দেশের জন্য সমান। অবশ্য দুয়েকটি ক্ষেত্রে বিকল্প বা পছন্দমতো সেবা বেছে নেয়ার সুযোগ আছে। যেমন- মিনা-আরাফায় কোন জোনে তাঁবু নেয়া হবে, কোন সার্ভিস প্যাকেজ গ্রহণ করা হবে প্রভৃতি। মক্কায় হোটেল-ভাড়া নির্ভর করে হারাম শরিফ থেকে হোটেলের দূরত্ব ও মানের ওপর; মদিনাতেও তাই। সরকার তথা ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ, কল্যাণ তহবিল, প্রচার, আইটি চার্জ, আইডি কার্ড প্রভৃতি বাবদ এক হাজার ৫০০-এক হাজার ৬০০ টাকা নিয়ে থাকে।
২০২৭ সালের হজে প্রকৃতপক্ষে বিমানভাড়া ছাড়া অন্য কোনো খাতে দরকষাকষির সুযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিমানভাড়া গত হজের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কমেছে। বিগত কয়েক বছরের বিমানভাড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল এক লাখ ৪০ হাজার টাকা; কিন্তু ২০২৩ সালে একবারে ৫৭ হাজার ৭৯৭ টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালে বিমানভাড়া তিন হাজার ৭৯৭ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ২০২৫ সালে বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ৬৭ হাজার ৮২০ টাকা। সর্বশেষ ২০২৬ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা। ২০২৭ সালের হজে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিমানভাড়া কমিয়ে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হজ ফ্লাইটে বিমানভাড়া কমানোর সরকারের এই উদ্যোগ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সরকারি মাধ্যমে হজ প্যাকেজ
২০২৭ সালে সরকারি মাধ্যমে দু’টি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। যথা : ‘হজ প্যাকেজ-১’ ও ‘হজ প্যাকেজ-২ (সাশ্রয়ী)’। হজ প্যাকেজ-১-এর হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহিঃচত্বর থেকে এক হাজার-এক হাজার ৪০০ মিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া এরিয়ায় আবাসন সুবিধা দেয়া হবে। মিনায় জোন-২-এ তাঁবুসহ মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিস এবং অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধসাপেক্ষে রুম আপগ্রেডেশন ও শর্ট প্যাকেজ সুবিধা নেয়া যাবে। এই প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ছয় লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা।
অন্য দিকে হজ প্যাকেজ-২ (সাশ্রয়ী) একটি সুলভ প্যাকেজ। এই প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হোটেল হারাম শরিফের বহিঃচত্বর থেকে দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে হবে। মদিনায় মারকাজিয়া এলাকার বাইরে মসজিদে নববী থেকে ৮০০ মিটারের মধ্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। মিনায় জোন-৫-এ তাঁবুসহ মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিস এবং অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। হোটেলের অবস্থান দুই কিলোমিটারের বেশি দূরে হলে সৌদি সরকারের বিধান অনুসারে সালাওয়াত বাসের ব্যবস্থা থাকবে। এই প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার ৬৪৮ টাকা।
বেসরকারি মাধ্যমে হজ প্যাকেজ
বেসরকারি তথা হজ এজেন্সির জন্য ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এ প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহিঃচত্বর থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মসজিদে নববী থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে আবাসন সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এক রুমে সর্বোচ্চ ছয়জনের আবাসনের ব্যবস্থা রাখা যাবে। মিনায় জোন-৫-এ তাঁবুর অবস্থান হবে। মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিসসহ অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। হোটেলের অবস্থান দুই কিলোমিটারের বেশি দূরে হলে সৌদি সরকারের বিধান অনুসারে সালাওয়াত বাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা।
হজ এজেন্সিগুলোর সরকার অনুমোদিত ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নিতে হবে। গ্রুপভুক্ত এজেন্সিগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে। তবে সরকার ঘোষিত হজ প্যাকেজ-২-এ বর্ণিত সেবা-সুবিধাদি কমিয়ে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে না। ঘোষিত প্যাকেজগুলো হজ পোর্টালসহ এজেন্সির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। দমে শোকর বা আদাহি ও ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক হওয়ায় এ দু’টি খাতের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে না।
সৌদিপ্রান্তের ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের সাশ্রয়ী উদ্যোগ
সৌদি সরকার প্রায় প্রতি বছর হজ ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে থাকে। ২০২৭ সালের হজেও সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় হাজীদের সেবা, আবাসন ও ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতায় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। মক্কা ও মদিনায় হজযাত্রীদের আবাসন, যাতায়াত, ক্যাটারিং, তাঁবু, মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ প্রভৃতিকে একটি সমন্বিত প্যাকেজের মধ্যে আনার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি সরকার। ২০২৬ সালের হজে চারটি সার্ভিস প্যাকেজ ছিল; কিন্তু ২০২৭ সালের হজে মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ হবে তিনটি; ‘ডি’ সার্ভিস প্যাকেজটি থাকবে না। ২০২৭ সালের হজে মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজগুলো সার্ভিস প্যাকেজ-১, সার্ভিস প্যাকেজ-২ ও সার্ভিস প্যাকেজ-৩ নামকরণ করা হবে। সর্বশেষ হজে সরকারি মাধ্যমে সর্বনিম্ন প্যাকেজ তথা হজ প্যাকেজ-৩-এর হজযাত্রীদের জন্য ‘ডি’ সার্ভিস প্যাকেজটি গ্রহণ করা হয়েছিল, যার মূল্য ছিল দুই হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল। ২০২৭ সালের হজে সর্বনিম্ন সার্ভিস প্যাকেজ তথা সার্ভিস প্যাকেজ-৩ ধরে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মূল্য তিন হাজার ২০০ সৌদি রিয়াল। সৌদি সরকারের মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ আপগ্রেডেশনে ২০২৭ সালের হজে শুধু সার্ভিস প্যাকেজে গত হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজের তুলনায় বাংলাদেশী মুদ্রায় ২৩ হাজার ২৪০ টাকা খরচ যোগ হয়েছে।
২০২৭ সালের হজে হাফ বোর্ড ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৬ সালে সরকারি মাধ্যমে সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য ছিল চার লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা। এ হজ প্যাকেজে খাবার খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। প্যাকেজের বাইরে হজযাত্রীদের আলাদাভাবে খাবারের টাকা সাথে নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এ বছর ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক হওয়ায় প্যাকেজে এক হাজার ১৯০ সৌদি রিয়াল যোগ হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩৯ হাজার ৫০৮ টাকা। বর্তমানে সৌদি রিয়ালের বিনিময় হারও কিছুটা বেড়েছে। ফলে ২০২৭ সালের সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজে তিন হাজার ৮২৬ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া সৌদি সরকার ২০২৭ সালের হজে ব্যাক-আপ অ্যাকোমোডেশন এক শতাংশ থেকে দুই শতাংশে উন্নীত করার বিধান চালু করায় প্যাকেজে বাড়তি এক হাজার ৩২৮ টাকা যোগ হয়েছে। অর্থাৎ সার্ভিস আপগ্রেডেশন, বাধ্যতামূলক ক্যাটারিং, মুদ্রার বিনিময় হার ও ব্যাক-আপ অ্যাকোমোডেশনের হার বাড়ানোয় প্যাকেজে বাড়তি যোগ হয়েছে ৬৭ হাজার ৯০২ টাকা। ২০২৬ সালের সর্বনিম্ন প্যাকেজ অপরিবর্তিত থাকলেও ২০২৭ সালে খরচ হতো পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯ টাকা; কিন্তু সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে তা কমিয়ে পাঁচ পাঁচ হাজার ৬৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে প্রকৃত অর্থে ২৯ হাজার ৩৯১ টাকা খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।
প্রবাসীবান্ধব উদ্যোগ
শুধু বিমানভাড়া বা প্যাকেজ মূল্য নয়, প্রবাসীদের ভ্রমণ খরচ ও বিড়ম্বনা লাঘবে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের হজে প্রবাসী বাংলাদেশী হজযাত্রীরা অবস্থানরত দেশ থেকে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও টিকা নিয়ে ভিসার আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি তারা যাতে সরাসরি অবস্থানরত দেশ থেকে হজের জন্য সৌদিতে পৌঁছাতে পারেন, সে বিষয়েও সরকার কাজ করছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, ২০২৩ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল প্রায় দুই লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০২৭ সালের হজে বিমানভাড়া নির্ধারিত হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিমানভাড়া কমানো সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। হজের খরচ কমানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশী হজযাত্রীদের অর্থ, সময় ও ভ্রমণ সাশ্রয়ে গৃহীত উদ্যোগ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়