বাংলাদেশ একটি দুর্যোগগ্রস্ত রাষ্ট্র। দুর্যোগ, দুর্গতি, দুর্ভোগ যেন দেশের নিয়তি। শিল্পোন্নত চীনে চুটিয়ে ব্যবসায় করছে ভারত। উভয়ের সম্পর্ক যত খারাপ হোক না কেন, চীনে ভারতের ব্যবসায় করতে কোনো সসম্যা হচ্ছে না। চীন আমেরিকাকে টপকে যেতে উদ্যোগ নিয়েছে। থাইল্যান্ড শিল্পোন্নত। থাইল্যান্ডে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরও শিল্পে উন্নতি ব্যাহত হয়নি। বাংলাদেশ এসব দেশ থেকে অনেক পিছিয়ে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের তুলনায় অবকাঠামো উন্নয়ন খরচ অনেক বেশি। এমনকি আশপাশের দেশগুলোর তুলনায়ও সড়ক অবকাঠামো খাতে এই ব্যয় তিন থেকে চারগুণ বেশি। সমীক্ষা সঠিক না হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধি, পরামর্শক খাতে ব্যয়, প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হতে বিলম্ব- ইত্যাদি ক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে দুর্নীতির ফাঁদ। এ ফাঁদে অবকাঠামো থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে যায়। ২৪ কিলোমিটারের ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো সড়ক নির্মাণ খচর ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে তিনগুণ বেশি। এসব দেশে ২১৭ কোটি থেকে ৬৩০ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ পড়লেও বাংলাদেশে এই একল্পে ব্যয় বেড়ে এক হাজার ১২৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চার বছর ১০ মাসে যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা, সেটি এখন এক যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। খরচ বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি বা ১০ হাজার ১৪৪ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। প্রকল্প দলিলের সর্বশেষ তথ্যে মিলেছে এর সত্যতা মিলে।

বিভিন্ন দেশের সাথে খরচের তুলনা : চীনের পাহাড়ি এলাকায় খরচও বাংলাদেশের চেয়ে কম: চীনে ইবিন-পাঞ্জিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ এলিভেটেড অংশ হিসেবে নির্মিত। পাহাড়ি ভূখণ্ড, অসংখ্য সেতু ও টানেলের মতো জটিল প্রকৌশল কাজ থাকা সত্ত্বেও এভি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২০ কোটি ইউয়ান বা বাংলাদেশী টাকায় ৩৬৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হয়েছে। তবে চীনের প্রকল্পটির বিপুল দৈর্ঘ্যরে কারণে ৪২৭ কিলোমিটারের প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি ব্যয় ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে করিডোরের সাথে সরসারি তুলনা করা যায় না।

মালয়েশিয়ার ডাস : বেশি ব্যয়; কিন্তু সুবিধা বেশি : মালয়েশিয়ার দামনসারা-শাহ আলম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ডাস) বাংলাদেশের জন্য উপযোগী তুলনা হতে পারে। ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার ৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন রিঙ্গিত; অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২০ দশমিক ৮ কোটি রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬৩০ কোটি। তবে ডাসের ব্যয়ের বিনিময়ে শুধু উড়াল সড়ক নয়, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, একাধিক ইন্টারচেঞ্জ শব্দ-প্রতিরোধক বেড়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎসংক্রান্ত সুবিধাদি এবং অবিরাম টোল আদায় ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন সুবিধা আছে। এর পরও দেশটির কিলোমিটারে ব্যয় ৬৩০ কোটি টাকা।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা : ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা-সিকাম্পেক ও এলিভেটেড টোল রোড প্রকল্পও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ৩৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড টোল রোডের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১১ দশমিক ৬৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া; অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার প্রায় ৪১৭ বিলিয়ন রুপিয়া। ২০২৬ সালের কাছাকাছি বিনিময় হার ধরে এটি প্রায় ৩২৪ কোটি বাংলাদেশী টাকা প্রতি কিলোমিটার।

ভারতের প্রকল্পে ব্যয়ের চিত্র : ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েব তথ্য মতে, চেন্নাই বন্দর-মাদুরভয়াল উড়ালপথ ২০ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-টিয়ার এলিভেটেড করিডোরটির ব্যয় সাড়ে তিন হাজার কোটি রুপির বেশি। আগামী বছর কাজ শেষ হওয়ার কথা। হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ১৬৭ কোটি রুপি বা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২১৭ কোটি বাংলাদেশী টাকা।

মুম্বাইয়ের ইস্টার্ন ফ্রিওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। মহারাষ্ট্রের মুম্বাই মেট্রোপলিটন রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদিত পরিমাণ তিন হাজার ৩১৪ কোটি রুপি। নির্মাণ চুক্তির মূল্য দুই হাজার ৬৮২ কোটি রুপি। চুক্তি ব্যয় ধরে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৯৩ কোটি রুপি বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম খরচ।

বর্তমান সংসদ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত; অর্থাৎ সরকার এবং বিরোধী দল জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তারা উভয়ে পরস্পরকে জনকল্যাণের স্বার্থে সহায়তা করার প্রতিশ্রুটি দিয়েছে। তাই আশা করা যায়, সরকার দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে। তাহলে ব্যয় কমে আসবে। বাংলাদেশে পণ্যের অভাব নেই; কিন্তু দাম বেশি। রফতানি বাড়ছে, আমদানি ঠিক আছে। তাহলে পণ্যের মূল্য বাড়বে কেন?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট