গত ছয় মাস ধরে ইরান ও আমেরিকা যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমেরিকা তার সামরিক শক্তির সবটুকু দিয়েই ভয়াবহ হামলা (সর্বমোট ১৩ হাজার হামলা) করছে ইরানে। আর ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই মার্কিন সামরিক স্থাপনা তছনছ করে দিয়েছে। ফলে মার্কিন সামরিক শক্তির ‘মিথ’ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এতে নিজেদের নিরাপত্তা আমেরিকানদের হাতে ইজারা দেয়ার নাজুকতা বুঝতে পারছে। নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে এখন বিকল্প ভাবতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় ‘মক্কা চুক্তির’ মধ্য দিয়ে একটি নতুন ‘মুসলিম প্রতিরক্ষা জোটের’ উত্থান ঘটেছে। এতে ভারত শঙ্কিত হয়ে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব আরো ঘনিষ্ঠ করছে। এটি কি বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের কোন অগ্রিম বার্তা?
ইরান যুদ্ধের চোরাবালিতে আমেরিকা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরের আলো ফোটার আগেই মার্কিন-ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আচমকা ভয়াবহ হামলা চালায়। হামলার প্রথম প্রহরেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিসহ প্রায় ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক নেতা নিহত হন। সেই সাথে একটি গার্লস নার্সারি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের প্রায় ১৫০ জন কন্যাশিশু নিহত হয়। এ হামলাটা আমেরিকা চালিয়েছিল ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান-আমেরিকার মধ্যে আলোচনা চলাকালে। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই ইসরাইল-মার্কিন এই কাপুরুষোচিত হামলায় ইরান হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু অল্পসময়ের মধ্যেই ইরান পরিস্থিতি বুঝে ওঠে এবং পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক স্থাপনাসমূহে এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে। টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর আমেরিকা ইরানের শক্তিমত্তার গভীরতা টের পায়। ফলে ট্রাম্প পাকিস্তানের সহযোগিতায় যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করে।
কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানোর পর পাক দূতিয়ালিতে যুদ্ধ সমাপ্তির উদ্দেশে ৬০ দিনের আলোচনার শুরুর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ৬০ দিনের আলোচনা শুরুর পরপরই ৭ জুলাই আবার আমেরিকা ইরানে আক্রমণ চালালে ইরান আলোচনা বর্জন করে আরো শক্তিশালী পাল্টা হামলা চালায়। এই দফায় ১৩ দিনের যুদ্ধের পর আমেরিকার মারাত্মক অস্ত্র ঘাটতির জন্য আবার হামলা বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি দিতে বাধ্য হয়। এ পরিস্থিতিতে আমেরিকা এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। কিন্তু ইরান মার্কিন শর্তে যুদ্ধ বন্ধে রাজি না হয়ে নিজেরাই কঠিন শর্ত ছুড়ে দিচ্ছে আমেরিকাকে। এতে আমেরিকা এখন তাদের যুদ্ধের উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে সেটিকে ছোট করে নিয়ে এসেছে।
প্রথমে মার্কিন লক্ষ্য ছিল খামেনিকে হত্যা করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা। সেটা পুরোপুরি ব্যর্থ হলে তারা ইরানকে আত্মসমর্পণ করানোর কথা বলে। কিন্তু এখন সর্বশেষে মার্কিন উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হরমুজ প্রণালী মুক্ত করা’! ইরান প্রথমে মার্কিন হামলার জবাবে প্রতি-আক্রমণ করার পরিকল্পনা সাজিয়ে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মার্কিন শক্তির অগভীরতা বুঝতে পেরে ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে তাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়। পরে তারা কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে মার্কিনিদের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলার রণকৌশল গ্রহণ করে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করুণ পিছুটান দেখে ইরান আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এখন তারা আমেরিকা কর্তৃক তাদের আগে জব্দকৃত অর্থের ছাড় এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়ার শর্তে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার কথা জানায়। আমেরিকার অবস্থা এতই নাজুক যে, এখন ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিতের কথা জোর দিয়ে বলছে না। আমেরিকা এই যুদ্ধে এক গভীর খাদে আটকে পড়েছে বলে মনে হয়। এরই মধ্যে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
যুদ্ধের বাই-প্রোডাক্ট
ইতোমধ্যে এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা মাত্র ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর শক্তিমত্তার দুর্বলতা নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে গেছে। সুপার পাওয়ার হওয়ার পর এই প্রথম আমেরিকার যুদ্ধাস্ত্র ঘাটতির ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকার এই দুর্বলতা প্রকাশের সাথে মুদ্রার অপর পিঠ অর্থাৎ ইরানের শক্তিমত্তার উত্থান ঘটে গেছে। ফলে আমেরিকা যে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সেটি এখন স্পষ্ট। তারা প্রতীকী কোনো জয় দেখিয়ে হলেও যুদ্ধ থেকে আপাত মুক্তি চাচ্ছে। এভাবেই আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটিগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে মার্কিনিরা তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের সীমান্তবর্তী দেশ ইরাকে শিয়াদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং এখানে ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও মার্কিন বাহিনী বা সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্বের বিষয়ে আমেরিকাকে পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। কারণ এই যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের বন্ধুরাষ্ট্র ওমানেও বোমা ফেলার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প! অন্য দিকে এশিয়া অঞ্চলে সেনা মোতায়েনকৃত মার্কিন রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মোতায়েন করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাই-প্রোডাক্ট হলো সৌদি নেতৃত্বে সুন্নি মুসলমানদের একটি ‘যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের’ উত্থান। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি সামরিক জোটের ঘোষণা এসেছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই জোটের উদ্ভব ঘটিয়েছে। এ জোটটির বিস্তারিত এখনো প্রকাশিত না হলেও মূলমন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘এই তিনটি দেশের যেকোনো একটিতে বহিঃশক্তির আক্রমণ তিনটি দেশের ওপরই আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে।’ প্রথমে পাকিস্তান ও সৌদি আরব গত বছর এ ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। এবার তুরস্ক এতে যোগ দিয়েছে এবং অন্যান্য আগ্রহী মুসলিম দেশগুলোকে যোগদানের পথ খোলা রয়েছে বলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান জানিয়েছেন। পাকিস্তানের ‘পারমাণবিক শক্তি’, সৌদির ‘পেট্রোডলার ও মুসলিম বিশ্বের আবেগ’ এবং তুরস্কের ‘সমৃদ্ধ প্রতিরক্ষা শিল্প’ মিলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জোট হতে যাচ্ছে এটি। বোঝাই যাচ্ছে এতে আরো মুসলিম দেশ যুক্ত হতে পারে। ইতোমধ্যে মিসরের নামও শোনা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যবস্থার ওপর প্রভাব
ইরান-আমেরিকার এই চলমান যুদ্ধ গোটা বিশ্বব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রথমত, একক মেরুর বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক শক্তির দুর্বলতার সুযোগে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নতুন বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব হতে পারে। সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের নেতৃত্বে সুন্নি মুসলমানদের বড় জোট হলে ইরান এতে যোগ না দিলেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ শান্তি অবস্থান গ্রহণ করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপরীতে রাশিয়া ও চীনও এই জোটকে বিরক্ত করতে চাইবে না। অন্য দিকে দেখা যাচ্ছে ‘মক্কা চুক্তি’র পরই ইসরাইল ও ভারত দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। ইসরাইল-ভারত তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের দ্বারস্থ হলে আরেকটি কাউন্টার জোট গড়ে উঠতে পারে। এমনটি হলে হয়তোবা যুক্তরাষ্ট্র শাসিত একক মেরুর বিশ্বের অবসান হয়ে যেতে পারে।
‘মক্কা চুক্তির’ বিস্তার ঘটলে এর প্রভাবে ‘ওআইসি’ ও ‘আরব লিগ’ একটি অর্থবহ সংস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘ওআইসি’ যদি তার নিজস্ব অরবিটে ফিরে আসে তবে সামরিক, অর্থনৈতিক, সামরিক-সাংস্কৃতিক এবং বাণিজ্যিক সর্ব ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে একটি বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে যত সহজেই আশাবাদী হওয়া যায় বাস্তবতা অনেক দুরূহ হওয়ার অনেক কারণও আছে।
যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি
যুদ্ধ বর্তমানে একটি স্থবির অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। আমেরিকা তাদের যুদ্ধের উদ্দেশ্য এখন ‘তেলের দর নিয়ন্ত্রণ’ বলে জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘ইরানের সাথে সামরিক টানাপড়েনের মধ্যে পরমাণু প্রযুক্তির বিকাশ ঠেকানোর চেয়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য ‘তেলের দাম স্বাভাবিক’ রাখাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র’ (দৈনিক নয়া দিগন্ত : ১৬-০৮-২০২৬)। ফলে ইরানকে বাগে আনার জন্য সামরিক আক্রমণাত্মক ভূমিকা থেকে এখন ইরানের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা উপলব্ধি করে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের কষ্টের প্রহরটা দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী করার ফাঁদে ফেলে অবরোধ আরোপে নিয়োজিত সামরিক ফ্যাসিলিটিগুলোতে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে মার্কিন জনবল এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ ও যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। এর মধ্যেও হয়তোবা আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের ঘটনা ঘটবে। কিন্তু তা ‘নিম্ন তীব্রতার সঙ্ঘাত’ (লো ইনটেনসিটি কনফ্লিক্ট) নামের যুদ্ধে মোড় নেয়ার শঙ্কা আছে। তবে শান্তি নির্ভর করবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্থির মনস্তত্ত্ব কতটুকু বাস্তবমুখী হয় এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তার সিদ্ধান্তগুলো কতটুকু নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে তার ওপর। এ ছাড়া পাকিস্তান বা কাতারের দূতিয়ালি, ইসরাইলের প্রতি ভালোবাসা এবং অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে কতটুকু কিভাবে প্রভাবিত করবে, সেটিও চলমান যুদ্ধটির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক