২০২৬ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে, শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে তার বাসভবন থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। তিনি সাংবাদিকদের সামনে সরাসরি উপস্থিত হননি, এমনকি ভিডিও কনফারেন্সেও যুক্ত হননি; তিনি শুধু অডিওর মাধ্যমে কথা বলেন। তা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে তার দেয়া ঘোষণাটি সংবাদমাধ্যমের একটি অংশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সাথে তার হতাশাগ্রস্ত সমর্থকদের মধ্যেও নতুন করে আশার সঞ্চার করে। তবে তার এই দেশে ফেরার পরিকল্পনার সামনে একটি বড় ধরনের বাধা রয়ে গেছে। জুলাই বিপ্লব দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। ফলে যেকোনো মুহূর্তে দেশে ফিরলে তিনি গ্রেফতার, কারাবাস ও সেই দণ্ডাদেশ কার্যকরের মুখোমুখি হবেন। এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তার সমর্থকদের মধ্যে এখন আরেকটি প্রশ্ন জেগেছে- আদালতে বিচারাধীন অন্য কোনো মামলা কি এই অস্বস্তিকর আইনি বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনার জন্য দেশে ফেরার কোনো বিকল্প দরজা খুলে দিতে পারে?
এমন পরিস্থিতিতে তাদের আশার শেষ অবলম্বন হিসেবে সামনে আসে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মামলা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ ক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি যার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ সম্পন্ন করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তৎকালীন সরকারের অধীন ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়- আইনজীবীদের এমন আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে মাওলানা আজাদ বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলেন। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটলে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার দণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছিল। আগামী ৩১ আগস্ট আপিল বিভাগে তার আপিলের শুনানি হওয়ার কথা। মাওলানা আজাদ ও শেখ হাসিনা- উভয়ের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে, এই একটিমাত্র মিলের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক এখন দাবি করছেন, আজাদের মামলাটি শেখ হাসিনার দেশে ফেরায় একটি আইনি পথ খুলে দিতে পারে। প্রসিকিউশনও বিষয়টি এতটা গুরুত্বের সাথে নিয়েছে যে, এটি নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু আইনের বিচারে দু’টি মামলার মধ্যে একটি অভিন্ন প্রক্রিয়াগত বৈশিষ্ট্য থাকা মানে এ নয় যে, মামলা দু’টি পরস্পরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। দুই মামলার কথিত সাদৃশ্য আসলে বাহ্যিক; ফলে এ নিয়ে প্রসিকিউশনের উদ্বেগও যথার্থ নয়। মাওলানা আজাদের বিচারাধীন আপিলের মূল বিষয়বস্তু নিয়ে এ নিবন্ধে কোনো সিদ্ধান্ত না টেনে আমরা দেখব- কেন তার মামলা শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো স্বয়ংক্রিয় আইনি পথ খুলে দেয় না।
কেন এই তুলনা ভ্রান্ত, তা বুঝতে হলে আগে জানতে হবে আওয়ামী লীগ আমলে পরিচালিত বিচারগুলোর ত্রুটি কোথায় ছিল। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মামলাটিও সেসময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় সব মামলার মতো একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন এবং সেই আইনের সমানভাবে ত্রুটিপূর্ণ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলার রায়ে আপিল বিভাগ কার্যত কথাটিই স্বীকার করে নেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত মানদণ্ড এবং ফৌজদারি বিচারের মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণ না করায় ন্যায়বিচার ব্যর্থ হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে যারা দাঁড়িয়েছিলাম, তাদের কাছে আপিল বিভাগের এ স্বীকৃতি মোটেও বিস্ময়কর ছিল না। কারণ আমরা ২০১২ সাল থেকে একই আপত্তি জানিয়ে আসছিলাম। আন্তর্জাতিক আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এখন অবশ্য আর শুধু অভিযোগ বা আশঙ্কার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না; ফল কথা বলছে। জুলাই বিপ্লবের পর আপিল বিভাগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে যে তিনটি আপিলের শুনানি হয়েছে, তিনটিতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এগুলো এমন মামলা ছিল না, যেখানে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বরং বিপরীতটা ঘটেছিল- ন্যায্যভাবে নিজেদের পক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগ তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। সেই বঞ্চনার ফলে যে অবিচারের জন্ম দিয়েছিল, দেশের সর্বোচ্চ আদালত এখন সেগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছেন।
শেখ হাসিনার মামলার চিত্রটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তার বিচার শুরু হয় এমন একসময়ে, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করে তাকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণের মধ্যে ছিল নিজের টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড। তার সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাক্ষ্য; ওই কর্মকর্তা পরবর্তীতে রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রসিকিউশনকে অতীতের বহু বছরের ধুলো সরিয়ে অস্পষ্ট স্মৃতি ও দূরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে মামলার কাঠামো নির্মাণ করতে হয়নি। জুলাই বিপ্লবের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিচার অনুষ্ঠিত হওয়ায় সাক্ষীরা ছিলেন হাতের নাগালে। সংঘটিত ঘটনাগুলোর স্মৃতি তখনো তাদের মনে ছিল একেবারে সতেজ।
সুতরাং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার হওয়া অন্যদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। সেই সময়ের বিচারগুলোতে প্রসিকিউশনের সাক্ষীরা প্রায়ই তদন্তকারীদের কাছে আগে দেয়া বক্তব্যের সাথে আদালতে দেয়া বক্তব্যের সাংঘর্ষিকতা তৈরি করতেন। এ অসঙ্গতি সামাল দিতে ঢাকার কমলাপুরে একটি নিরাপদ স্থানে সাক্ষীদের ‘প্রস্তুত’ করা হতো। তাতেও যখন সমস্যার সমাধান হলো না, তখন ২০১৩ সালে আপিল বিভাগ এমন একটি সিদ্ধান্ত দেন, ফলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের তাদের পূর্ববর্তী পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সম্পর্কে জেরা করতে পারতেন না; অর্থাৎ প্রমাণ যখন প্রসিকিউশনের দাবিকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হলো, তখন সেই দুর্বলতা যাতে আসামিপক্ষ আদালতে উন্মোচন করতে না পারে, সে অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ার নিয়ম বদলে দেয়া হয়। তদন্ত থেকে প্রসিকিউশন, প্রসিকিউশন থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া- সব পর্যায়ে আপস করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার বিচারে এর কোনোটি ঘটেনি। এমনকি তিনি এ দাবিও করতে পারেন না যে, তাকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক সরকারের নির্দেশে বিচার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালিত হয়েছিল একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। সুতরাং শেখ হাসিনা ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মামলা শুধু কিছু বিবরণে নয়, মৌলিক আইনগত বাস্তবতার দিক থেকে পরস্পর ভিন্ন। মাওলানা আজাদের মামলায় যেসব পরিস্থিতি বিচারিক অবিচারের জন্ম দিয়েছিল, শেখ হাসিনার মামলায় সেই পরিস্থিতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জুলাই বিপ্লবের পর আপিল বিভাগে যে তিনটি আপিলের শুনানি ও নিষ্পত্তি হয়েছে, প্রতিটি মামলাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও অন্যান্য প্রসিকিউটর আপিলের বিরোধিতা করেছেন। একই সাথে আদালতকে মূল দণ্ড বহাল রাখার আবেদন জানিয়েছেন। তাদের এমন অবস্থান নেয়ার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেয়া প্রতিটি দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল হলে তার বিরোধিতা করা বর্তমান প্রসিকিউশনের কোনো স্বতঃসিদ্ধ দায়িত্ব হতে পারে না। কারণ দেশের সর্বোচ্চ আদালত ইতোমধ্যে স্বীকার করেছেন যে, সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অবিচার সংঘটিত হয়েছিল। যে বিচারব্যবস্থা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, সেই ব্যবস্থার অন্যায় রায়কে রক্ষা করা নয়; বরং তার ভুলকে স্বীকার করে সংশোধনের পথ তৈরি করা হওয়া উচিত বর্তমান প্রসিকিউশনের দায়িত্ব।
সরকারের ধারাবাহিকতার নীতি (প্রিন্সিপাল অব কন্টিনিউইটি অব গভর্নমেন্ট) দেখিয়েও এমন অবস্থানকে যৌক্তিকতা দেয়া যায় না। সাধারণত এ নীতি কার্যকর হয় তখন, যখন গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে এক সরকার থেকে আরেক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটে। জুলাই বিপ্লব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঘটনা। এটি একজন স্বৈরশাসক ও তার দমনমূলক শাসনের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থার ভিতেও মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। বিচার বিভাগের ব্যাপক পুনর্গঠনেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। নতুন গঠিত আপিল বিভাগে একজন ছাড়া অন্য সব বিচারক হাইকোর্ট বিভাগ থেকে নতুনভাবে উন্নীত হয়েছেন; অর্থাৎ জুলাই বিপ্লব নিছক একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক, বিচারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীতের সাথে একটি সুস্পষ্ট ছেদরেখা। সেই কারণে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অধীন প্রসিকিউশনের সাবেক শাসনব্যবস্থার বিচার বিভাগের কর্মকাণ্ড রক্ষার কোনো দায় নেই। একইভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায় বিচারপ্রক্রিয়ায় জন্ম নেয়া দণ্ডাদেশকে কেবল ‘ধারাবাহিকতা’র নামে আঁকড়ে ধরে রাখারও কোনো নৈতিক বা আইনগত কারণ নেই।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি