বিশ্বের ১৭৩ শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতায় ঢাকা শহরের অবস্থান ১৭১তম। ঢাকার পরে আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলি ও সিরিয়ার দামেস্ক। উগান্ডা, ইথিওপিয়া বা ঘানার মতো আফ্রিকার দেশগুলোর শহরও এখন ঢাকার চেয়ে বেশি বাসযোগ্য। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (ইআইইউ)-এর গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নগরবিদরা বলছেন, ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো সর্বোচ্চ ৮০ লাখ মানুষের বসবাসের উপযোগী। কিন্তু এই ক্ষীয়মাণ ও অপরিকল্পিত নগরীতে এখন তিন কোটি ৬৬ লাখ মানুষ গাদাগাদি করে বাস করছে, যা ধারণক্ষমতার ১৩ গুণেরও বেশি। জাতিসঙ্ঘের আবাসন প্রোগ্রামের মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে প্রতি একরে সর্বোচ্চ ১২০ জন মানুষ বাস করার কথা, সেখানে ঢাকায় বাস করছে গড়ে ৮০০ জন। এর ওপর প্রতিদিন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরো প্রায় চার হাজার মানুষ। এতে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎসহ প্রতিটি নাগরিক পরিষেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। চারপাশ এখন দূষণ, যানজট আর ডাস্টবিনের ভাগাড়। খোদ সরকারের নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রীরাও স্বীকার করছেন, ঢাকা এখন আর শ্বাস নেয়ার মতো শহর নেই।

ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে কেন এই বিপুল জনস্রোত প্রতিদিন ঢাকামুখী হচ্ছে? এর একটি কারণ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সঙ্কট, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট। আর এই ঘাটতির বেশির ভাগ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে জেলা-উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের ওপর। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে ঢাকার বাইরে নতুন কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না, বরং পুরনো কারখানাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে, বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক কারখানা। বেকার হয়েছেন প্রায় দুই লাখ শ্রমিক। জীবন ধারণের তাগিদে, কাজের খোঁজে এই প্রান্তিক মানুষেরা দলে দলে ঢাকায় ছুটে আসছেন। জীবিকার প্রয়োজনে অটোরিকশা চালানো বা হকারবৃত্তির মতো অনানুষ্ঠানিক ও অনুৎপাদনশীল পেশা বেছে নিচ্ছেন। ফলে রাজধানীর সড়কগুলো এখন লাখ লাখ অবৈধ অটোরিকশার দখলে, যা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরো স্থবির ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ঢাকা মহানগরকে বাসযোগ্য মনে হয় না। নিঃশ্বাস নেয়ার অবস্থা নেই। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে বসবাস করতে পারবেন না।

আমরাও সেটাই মনে করি। এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে। থামাতে হবে ঢাকামুখী আত্মঘাতী জনস্রোত। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার বাইরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসা এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। এই শহরকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। ঢাকা ছাড়া অন্য শহরগুলোতে কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। শক্তিশালী করতে হবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে। আমরা আশা করি, সরকার কালক্ষেপণ না করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে, যা ঢাকাকে বাঁচাবে। পুরো দেশকে নিয়ে আসবে সুষম উন্নয়নের আওতায়।