নদীভাঙন কুড়িগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা। ব্রহ্মপুত্রসহ ছয়টি নদ-নদীর ভাঙনে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় গত এক দশকে নদীতে বিলীন হয়েছে ১৫ হাজার একরের বেশি আবাদি জমি। প্রায় ৭০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। ব্রহ্মপুত্র, সোনাভরি, জিঞ্জিরাম, ধরলা, কালো ও হলহলিয়া নদীতে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভাঙন দেখা দিলেও পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের সময় তা ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১০ বছরে চরশৌলমারী, সোনাপুর, খেদাইমারী, সুখেরবাতি, ফুলুয়ারচর, পালেরচর, বকবান্ধা, চুলিয়ারচর, কোদালকাটি ও মোহনগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে চলে গেছে।

এ অঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগকে অনেকটা জীবনের নিয়তি মনে করছে। কিন্তু নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব। এ দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সমস্যার সমাধানে কোনো সরকারই উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে ভাঙনকবলিত সোনাপুর ও চরগেন্দার আলগা গ্রামের কয়েকটি পরিবার ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বসতভিটা হারিয়েছে। ভিটেমাটি হারানো নিঃস্ব মানুষ এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, গ্রামীণ সড়কের পাশে কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

নদীভাঙনের ফলে কুড়িগ্রাম শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে। এই জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার জন্যও সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না।

ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন নতুন নয়। তাহলে বছরের পর বছর ধরে কেন ভাঙন রোধের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না, এমন প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, অর্থসঙ্কট ও প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতার কারণে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব তীর সংরক্ষণে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীশাসন প্রকল্পের জন্য প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে রৌমারী-রাজিবপুর অঞ্চলে নদীভাঙন রোধ ও জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনে হাজারো মানুষ নিঃস্ব হবে, আর ভাঙন রোধের প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকবে— এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রান্তিক দরিদ্র জনগণকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অবহেলার সুযোগ নেই।

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু কুড়িগ্রামের নদীভাঙন সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। কুড়িগ্রামের মানুষ আশা করে, জনগণের কল্যাণে বিএনপি সরকার নদীভাঙন রোধে দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

নদীভাঙন নিয়ে সার্বিক তথ্য সরকারের কাছে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল আকারে পড়ে থাকে। শুধু ভাঙন রোধে উদ্যোগে প্রশাসনের শৈথিল্য কাটে না। এ অবস্থার অবসান দরকার। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন রোধে অবিলম্বে সব ধরনের কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি নদীভাঙনের শিকার মানুষদেরও পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।