তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ গতকাল এই রায় দেন। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রইল।

পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল হয়। এক ব্রিফিংয়ে গত বুধবার অ্যাটর্নি জেনারেল মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছিলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত দেশের সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই পরিবর্তনের সাথে মানুষের বাক্স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আগামী দিনের অগ্রযাত্রা, দেশের অগ্রযাত্রা, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা, সবকিছু বাধাগ্রস্ত ছিল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়।

আপিল বিভাগের গতকালের রায় দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। উল্লিখিত রায় শুধু একটি সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতের একটি কার্যকর কাঠামো ছিল। এটি নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও, এর মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচনকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিরপেক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সংবিধানে আমূল পরিবর্তন এনে তত্ত্বাবধায়ক ও গণভোটব্যবস্থা বাতিল করেন। তাই বলা যায়, আপিল বিভাগের গতকালের রায়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি অধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

অন্য দিকে গণভোটের বিধান পুনর্বহালে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি সামনে এনেছে। জনগণই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস, সাংবিধানিক এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে পারে গণভোটে। জাতীয় গুরুত্ব বিষয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের সুযোগ আরো শক্তিশালী করবে। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বৈধতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

তবে এ কথাও স্মরণে রাখা প্রয়োজন, কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিজে থেকে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে না। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা গণভোট, উভয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট আইন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। তাই এ রায়কে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংলাপের নবতর ভিত্তি হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত হবে।

এই রায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে পারস্পরিক অবিশ্বাসের রাজনীতি পরিহার করে সংলাপ, সমঝোতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে এ রায় সামনে রেখে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা এবং জনমতকে মর্যাদা দেয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হবে আমাদের এখনকার কর্তব্য।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আইনের শাসন, জনগণের অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা পুনর্গঠনে। আপিল বিভাগের রায় সেই পথে চলতে সুবর্ণ একটি সুযোগ হতে পারে। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের, এই সুযোগ কিভাবে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়। যেখানে জনগণের ভোট, মতামত এবং সাংবিধানিক অধিকার সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে।