দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। গত সোম ও মঙ্গলবার অন্তত চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ও ছাত্রশিবির এবং ছাত্রশক্তি নেতাকর্মীদের সাথে ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা, ঢাকা কলেজে ছাত্র সংঘর্ষে আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। গত সোমবার রাতে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ হয়েছে।

সংঘর্ষের মূল কারণ আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। সবই স্বৈরাচারী আমলের আলামত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজসহ আর্থিক সংশ্লিষ্টতার সব কাজ একচেটিয়াভাবে দখলের জন্য ছাত্রলীগ রাম দা, পিস্তল নিয়ে মাঠে নামত। ছাত্রদলসহ সব ছাত্রসংগঠনকে মেরে কেটে ক্যাম্পাসছাড়া করেছিল। ১৭ বছর ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি। এখন সেই ছাত্রদলের অনেকে ক্যাম্পাসে ঠিকাদারির কাজ দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রশাসনের প্রশ্রয় ও ছত্রছায়া পাচ্ছে বলে মনে করার কারণ আছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়া এবং অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করার দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে নির্বাচিত জসকু নেতারা এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা অডিটোরিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কারণ সেখানে এক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রধান উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রশাসন ও ছাত্রদল একসাথে তাদের বাধা দেয়। বাধার মুখে তারা অডিটোরিয়ামের বাইরে অবস্থান নেয়। এ পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা শান্ত ছিল এবং কোনো অনিয়মতান্ত্রিক আচরণ করেনি। কিন্তু প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা তাদের হুমকি দেন, ওখান থেকে সরে না গেলে ছাত্রদলকে দিয়ে তাদের উঠিয়ে দেয়া হবে। হুমকিদাতার পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এটি মাত্র একটি দৃষ্টান্ত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ডাকসুর প্রতিটি কাজে প্রশাসন কিভাবে অসহযোগিতা করছে, গোটা জাতি তা দেখেছে।

এভাবেই প্রশাসন ও ছাত্রদল দেশে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই সাথে আছে পতিত স্বৈরাচারের অনুষঙ্গ। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী এখন ছাত্রদলে ভিড়েছে। পরিস্থিতি সঙ্ঘাতময় করতে তাদের পরোক্ষ ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। শুধু তাই নয়, জাতীয় রাজনীতিতে সরকারি দলের কর্মকাণ্ডও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অনুকূল নয়। ফ্যাসিবাদমুক্তির জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনায় একটি গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল রাজনীতির দরকার, আমাদের সরকারি ও বিরোধী দলের সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতিতে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। তাদের দ্বান্দ্বিক অবস্থান জাতীয় রাজনীতিসহ শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ তাতিয়ে তুলছে।

শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আবারো ফ্যাসিবাদী আমলের মতো সাংঘর্ষিক হয়ে উঠলে তা কারো জন্যই শুভ হবে না। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সরকারি দলের। কারণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদেরই। যে মুহূর্তে পতিত স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা নতুন করে মাথা তোলার চেষ্টা করছে, সে সময় সতর্ক হতে হবে সরকারকেই। খতিয়ে দেখতে হবে, কেন পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটছে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের দায় কমই।