দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে স্বস্তির আভাস মিললেও উদ্বেগ কাটেনি। অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জগুলোর এখনো কার্যকর সুরাহা হয়নি। প্রবৃদ্ধি এখনো মন্থর, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামেনি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এখনো স্পষ্ট, সরকারের ঋণগ্রহণ ক্রমবর্ধমান। সবমিলিয়ে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের শেষপর্যায়ে অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছিল তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন সূচকে কিছুটা অগ্রগতি অর্জনের কারণে সামান্য স্বস্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ তথা রিজার্ভ বেড়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে এসেছে, মূল্যস্ফীতিও নিম্নমুখী। এসব কারণে অর্থনীতিতে খানিকটা স্বস্তির হাওয়া বইছে; কিন্তু দুর্বল ব্যাংকিং খাত, মাত্রাছাড়া খেলাপি ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে মন্থরতা এবং শিল্পে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট করে দেয়। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীলতা বিরাজ করলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা প্রকট।
তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩০.৩৩ শতাংশ। এর ফলে রিজার্ভ বেড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে দরকার উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প সম্প্রসারণ এবং সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বাড়তি রিজার্ভ দিয়ে এসব অর্জন করা যায় না। মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক নিম্নমুখী প্রবণতাও আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা জুনে ছিল ৯.১৬ শতাংশ। এর ফলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির গতি কমবে। পণ্যমূল্য থেকে যাবে আগের স্তরেই। অর্থাৎ খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য গত কয়েক বছরে যে স্তরে উঠেছে তা সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ কমাবে না।
নির্বাচিত সরকারের হাতে অর্থনৈতিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে বলে যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, তারও লক্ষণ স্পষ্ট নয়। আর্থিক খাতে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জোরালো প্রয়াস দেখা যাচ্ছে না। খেলাপি ঋণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও সরকার ঋণ আদায়ে কঠোরতার বদলে আগের মতোই পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে, ঋণখেলাপিদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। সেই সাথে সরকারের ব্যাংক ঋণ দ্রুত বাড়ছে; বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মন্থর। শিল্প উৎপাদনও নেতিবাচক। জ্বালানি খাতের ব্যর্থতায় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিবর্তে কারখানা বন্ধ হয়ে বেকার হচ্ছে শ্রমিকরা।
এর মধ্যেও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদের কথা বলছেন। এ আশাবাদ কতটা বাস্তবসম্মত বলা যায় না। প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে আওয়ামী সরকারের সময় সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ ছিল। চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। যেমন— ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন হয়নি, অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কারে হাত দেয়া হয়নি; বরং এ খাতে দুর্বৃত্তায়নের হোতাদের বিষয়ে নমনীয়তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়াসও দৃশ্যমান নয়। উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি আনার মতো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
সুতরাং অর্থনীতি নিয়ে এই মুহূর্তে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ পাবেন সামান্যই।