ভারতের চিকিৎসা ও পর্যটন খাতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে বাংলাদেশ। এই দুই খাত মিলে এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি বিদেশী যায় বাংলাদেশ থেকে। বিপুল অর্থের জোগানদাতা মেডিক্যাল ট্যুরিস্টদের সুযোগ-সুবিধায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয় না। চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত রোগীদের একটি অংশকে বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষেও আক্রান্ত হন। সম্প্রতি একটি হোটেলে আগুনে পুড়ে কয়েক বাংলাদেশী নিহত হওয়ার পর কলকাতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা পড়েছেন মহাবিপদে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা বিশেষ করে আবাসন সঙ্কটে পড়লেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সহজ করতে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে কলকাতার একটি হোটেলে ১৮ আগস্ট অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়। মির্জা গালিব স্ট্রিটের এ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসন কলকাতার হোটেল ও গেস্টহাউজগুলোর বিরুদ্ধে ঢালাও ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। শহরের ৭০০টির বেশি হোটেলকে খালি করার আদেশ দেয়। বিকল্প না রেখে একচেটিয়া সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসা ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশীরা বিপাকে পড়েছেন। আবাসিক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা না করতে পেরে ফুটপাথ ও রাস্তার পাশে রাত যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বেশি বিপদে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসায় যাওয়া রোগীরা। তারা খোলা জায়গায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এদিকে দ্রুত চিকিৎসা সেরে দেশে ফিরবেন— সেই ব্যবস্থাও অনেকে করতে পারছেন না।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগীরা সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে বৈধ উপায়ে কলকাতা গেছেন। দূতাবাস থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর ভারতে প্রবেশ করেছেন। হিসাব মতে, তারা ভারত সরকারের অতিথি। হোটেল ও গেস্টহাউজ বন্ধ করে দেয়ার আগে প্রশাসনের এদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা দরকার ছিল। সরকার চাইলে দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্রের মতো অস্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারত। উন্মুক্ত জায়গায় থাকা বাংলাদেশী রোগীদের বিষয়ে ভারত সরকার একেবারে উদাসীন। দায়দায়িত্বহীন। প্রতি বছর চিকিৎসা নিতে পাঁচ থেকে আট লাখ বাংলাদেশী ভারতে যান। এতে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার আয় করে ভারত। ২০২২ সালে ভারত ভ্রমণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশী পর্যটক সংখ্যা। এ খাতে দেশটি বিপুল আয় করে বাংলাদেশীদের কাছ থেকে। সেই হিসেবে বাংলাদেশী রোগী ও পর্যটকরা বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা। বাস্তবতা হলো— তারা অবহেলার শিকার হন। কিছুু ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করা হয় ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে হুমকি হামলা ও মারধরের শিকারও হতে হয় তাদের। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এরপরও একশ্রেণীর বাংলাদেশী দেশটিতে ভ্রমণ করতে বাড়তি উৎসাহ দেখান। চিকিৎসায় কিছু বিশেষায়িত রোগের জন্য ভারতে যাওয়ার যৌক্তিকতা আছে। সাধারণ চিকিৎসায় বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। অনেক রোগী যারা অনায়াসে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে পারেন তারাও দেশটিতে গিয়ে ভিড় জমান। এক্ষেত্রে রোগীদের ভারতমুখী প্রবণতা রোধে আমাদের দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের স্বাস্থ্যসেবার মান ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে রোগীদের এ বার্তা দিতে হবে, দেশেই উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। ভারতে গিয়ে হেনস্তা ও বিপদে পড়ার চেয়ে দেশের চিকিৎসায় আস্থা রাখা উত্তম।