একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা থেকে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। কোটি কোটি মানুষের রাস্তায় নেমে আসা তার নজির। অন্তর্বর্তী সরকার সেই লক্ষ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। তার কিছু বাস্তবায়ন করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, মতপ্রকাশের ওপর বাধা ও নাগরিকের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের এ-সংক্রান্ত দু’টি অধ্যাদেশ নির্বাচিত সরকার পরিবর্তন করে আরো শক্তিশালী আকারে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে সংসদে অনুমোদন দেয়নি। সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বিএনপি সরকারের মানবাধিকার ও গুম বিল, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ দুটো শক্তিশালীর পরিবর্তে দুর্বল করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সম্পত্তিবিষয়ক আরেকটি বিল মুসলিম আইন ও অনুশাসনের বিরোধী আখ্যা দিয়ে বিরোধী দল এ সময় সংসদ থেকে ওয়াক আউট করে।

বিপ্লব-পরবর্তী নাগরিক সমাজ অনুধাবন করে, কিভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল। সে কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়নের লক্ষ্য ছিল গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত অপরাধ দেশ থেকে সমূলে উৎপাটন করা। সংসদে পাস হওয়া বিল দুটো সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। পুরনো ২০০৯ সালের কমিশনের অনুসরণে মানবাধিকার বিলে একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। যেখানে কমিশনকে স্বাধীন ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; কিন্তু কমিশনের প্রধানসহ অপরাপর সদস্যদের বাছাই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন সংসদের স্পিকার। এর আগেও দেখা গেছে, এ ধরনের পদে থেকে রাজনৈতিক নেতারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি। এই কমিশন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন চাইতে পারবে। তাতে সন্তুষ্ট না হলে সুপারিশ দিতে পারবে। অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো শক্ত বিধান এতে নেই।

অন্য দিকে গুম বিলে তদন্তের ভার সরকারের হাতে থাকছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সমন্বয়ে গুমের অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ফলে গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে কিংবা পাঁচ বছর পরও ফিরে না এলে দায়ী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হলেও অপরাধী এ সাজা পাবেন, তার সম্ভাবনা কম। কঠোর শাস্তির বিধান তাই গুমনিরোধক হিসেবে কার্যকর না হওয়ার শঙ্কা আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিপ্রায়ের কারণে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও তা চাপা পড়ে যাচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (সরকার ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী) তারাই আবার তদন্তের কর্তৃপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ফলে মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ নিয়ে সরকার শক্তিশালী আইন করার কথা বললেও বাস্তবে তা আরো দুর্বল ও অকার্যকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। একই সময় ‘সম্পত্তি হস্তান্তর-২০২৬’ বিলে, দান করার পরও তা দানকারীর ভোগদখলে রাখার বিধান করা হয়েছে। এটি মুসলিম আইনের বিরোধী বলে দাবি করে স্কলারদের মতামত গ্রহণের বিরোধী দলের দাবি উপেক্ষা করে সংসদে পাস করা হয়েছে।

ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় চরম নিষ্পেষণের শিকার বিএনপি বহু আগে থেকে দেশের বড় ধরনের সংস্কারের রূপরেখা দিয়ে আসছিল। জুলাই বিপ্লব তাদের সেই সংস্কার কার্যক্রম সহজ করে দিয়েছিল। তারাও সরকার গঠন করলে সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। বাস্তবে দলটি যেন নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে। তাদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন জনগণকে আশাহত করবে।