পুলিশের সাবেক আইজি কুখ্যাত বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ের আদালতে জামিন পেয়ে গেছেন। হত্যা, গুম, সংখ্যালঘু নির্যাতন, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির প্রমাণিত অভিযোগ থাকার পরও তাকে সময়মতো দেশে ফিরিয়ে আনা যায়নি। জামিন পাওয়ার খবরও পাওয়া গেল বিলম্বে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মামলাকারী কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত রোববার পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছু জানতে পারেনি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দুবাইতে একটি ল ফার্ম নিয়োগ দেয়ার দাবি করে যেন দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অসংখ্য গুরুতর অপরাধ করার পরও তার এভাবে পার পেয়ে যাওয়া দুঃখজনক। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রস্তুতির অভাব ও গাফিলতি রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত্তি নির্মাণে যে ক’জন ব্যক্তি মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন তাদের অন্যতম বেনজীর। পুলিশের শীর্ষপদ আইজি থেকে সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে হাসিনা তার ওপর ভরসা রেখেছে। তাকে আইনশৃঙ্খলা সহায়ক বাহিনী র্যাবের প্রধানও বানানো হয়। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন। অবৈধ উপার্জনে গড়েছেন বিপুল বিত্তের পাহাড়। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ১৭টি, দুদকের ছয়টি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলা রয়েছে। এমন একজন দাগী অপরাধীকে ইন্টারপোল আটক করলেও তাকে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারা হতাশাজনক।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বেনজীরের মতো আরো কয়েক ডজন গুরুতর অপরাধী দেশ থেকে পালিয়ে গেছে। এর মধ্যে আদালতে সর্বোচ্চ দণ্ড পাওয়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার কসাই আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন। জুলাইতে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা ও তার আগে দেশে সংঘটিত গুম খুনের জন্য তিনি অভিযুক্ত। আদালতের রায় হওয়ার পরও তাকে ফেরানোর ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখা গেল না। তিনি ভারতে বসে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সরকার ও মানুষের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনেকে খুন গুম মুদ্রাপাচারসহ ভয়াবহ সব অভিযোগ নিয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদের অনেককে জনপরিসরেও দেখা যাচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন। পলাতক গুরুতর অপরাধীদের মধ্যে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এদের ফেরানোর ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই; বরং এরা যেভাবে বিদেশে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাতে বাংলাদেশ সরকারের তাদের বিরুদ্ধে কার্যকার তৎপরতা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে।
বিদেশে পলাতক অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা না গেলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দুর্বলতা ফুটে ওঠে। আবার এদের স্বাধীনভাবে বিদেশে অবস্থান দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতির জন্য স্পষ্ট হুমকি। বিশেষ করে সাবেক পুলিশ প্রধান, সামরিক বাহিনী প্রধান এবং অতীতে দেশের নিরাপত্তার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বেনজীরের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছে, গুরুতর অপরাধীদের ধরে আনা এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করে দেখা দরকার।