বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকিতে দেশ

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

বাদ পড়ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও

আগামী কয়েক বছরে বাড়তে পারে ব্যাপকতা

ভয়াবহ সাইবার ঝুঁকিতে পড়েছে দেশ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বাদ যাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। এমনকি পুলিশ সদর দফতরসহ বিভিন্ন সংস্থার দফতরগুলোকেও টার্গেট করে ছড়ানো হচ্ছে অপরাধমূলক ভুয়া তথ্য। এসব সাইবার অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও তা অপ্রতুল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী পাঁচ বছরে এআইবেজড ফ্রড, ডিপফেক ব্ল্যাকমেইল, ফিন্যান্সিয়াল ফিসিং, মোবাইল ব্যাংকিং ফ্রড, র‌্যানসমওয়্যার, ক্রিটিকাল ইনফ্রাসট্রাকচার অ্যাটাক এবং অনলাইন র‌্যাডিক্যালাইজেশন, ডার্ক ওয়েবভিত্তিক ডাটা বা তথ্য কেনাবেচার মতো অপরাধগুলো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে। এ ব্যাপারে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

একসময় পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড। পরে যুক্ত হয় মাদক, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ। কিন্তু বর্তমানে সে সব অপরাধের সাথে যুক্ত হয়েছে সাইবার অপরাধ। এখন অপরাধের বড় অংশ ঘটছে অনলাইন দুনিয়াতে। অপরাধীরা এখন ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল নম্বর, ফেক এনআইডি দিয়ে সিম, ক্রিপ্টো পেমেন্ট, এআই জেনারেটেড ভয়েস-ভিডিও, ডিপফেক, ফিশিং কিট, রিমোট অ্যাকসেস টুল এবং ডার্কওয়েব মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। বিদেশে বসে পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানবপাচার এবং সাইবার জালিয়াতি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেও গোলকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দফতরের নাম ব্যবহার করেও সাধারণ নাগরিকদের প্রতারিত করা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, বর্তমানে তাদের যে প্রযুক্তি ও ডিভাইস রয়েছে তা দিয়ে সাইবার জগতের ওপরের স্তর নিয়ে কাজ করতে পারলেও নানা কারণে ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে তথ্য নেয়া এখনো সম্পূর্ণরূপে সম্ভব হয় না। ফলে অপরাধীদের সুরক্ষিত অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ পেতে পুলিশের কাউন্টার পার্ট হিসেবে উন্নত অনেক দেশের সহযোগিতা চাওয়া হয়, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে সাইবার অপরাধকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। আমদানি করা হচ্ছে নতুন নতুন ডিভাইসসহ বিভিন্ন সফটওয়ার।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, দেশে-বিদেশে নিরাপত্তা হুমকির ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা জরুরি। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এটিইউর নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত প্রস্তাবনায় পুলিশে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তি পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রেখে পুলিশের সব উইং এখন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে।

অনলাইন জিডি, ডিজিটাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সিসি ক্যামেরা বিশ্লেষণ, সাইবার ক্রাইম তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণের মতো উদ্যোগ পুলিশের সেবা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ধাপে ধাপে চালু করা হয়েছে একাধিক ডিজিটাল সেবা। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি।

তবে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন উন্নয়ন সংযুক্ত করা হলেও এখনো অনেক ক্ষেত্রেই তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবেলায় অনলাইন প্যাট্রলিং জরুরি। ই-প্যাট্রলিংয়ের জন্য উন্নত সফটওয়্যার দরকার। পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো ম্যানুয়ালি অনলাইন প্যাট্রলিং করে থাকে। এ ছাড়া কোনো একটি অপরাধের ঘটনার পর প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে নিয়ে আসার সক্ষমতা এখনো পুলিশের তৈরি হয়নি। এ ছাড়া বহু দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যেকোনো ঘটনার নানা ধরনের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অপরাধীরা যেভাবে দ্রুত প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সেই তুলনায় সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অপরাধীরা এখন ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল নম্বর, ফেক এনআইডি দিয়ে সিম, ক্রিপ্টো পেমেন্ট, এআই জেনারেটেড ভয়েস-ভিডিও, ডিপফেক, ফিশিং কিট, রিমোট অ্যাকসেস টুল এবং ডার্কওয়েব মার্কেটপ্লেসসহ অসংখ্য অ্যাপস ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ফরেনসিক টুলস, ল্যাব সুবিধা, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত ডেটা পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের টেকনিক্যাল ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আমাদের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থান করে সংঘটিত অপরাধ মোকাবেলায় বাংলাদেশ আংশিক সক্ষম। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশী প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত তথ্য পাওয়া। মেটা, গুগল, টেলিগ্রাম, এক্স, ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডার বা বিদেশী ব্যাংকিং/ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ থেকে তথ্য পেতে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া লাগে। এ কারণে ক্রসবর্ডার অ্যাভিডেন্স ইকুইজিশন আরো শক্তিশালী করা জরুরি।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী পাঁচ বছরে এআইবেজড ফ্রড, ডিপফেক ব্ল্যাকমেইল, ফিন্যান্সিয়াল ফিসিং, মোবাইল ব্যাংকিং ফ্রড, র‌্যানসমওয়্যার, ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যাটাক এবং অনলাইন র‌্যাডিক্যালাইজেশন, ডার্ক ওয়েবভিত্তিক ডাটা বা তথ্য কেনাবেচার মতো অপরাধগুলো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলমান রয়েছে। বাহিনীতে নতুন প্রযুক্তির ডিভাইস সংযোজন, সেটি অপারেট করা ও রক্ষণাবেক্ষণে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরকে ব্যবহার করে গণমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য প্রচারের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু গণমাধ্যম সম্পূর্ণ ভুয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে দায়িত্বশীল কারো সাথে কথা না বলে গুজব ছড়াচ্ছে। যার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই।

এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতর একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে। যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপপ্রচার চালানোর বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে বলা হয়, এ ধরনের অপপ্রচার অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর, উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের দেশী-বিদেশী দোসররা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা, পুলিশ বাহিনীর মনোবল ক্ষুণœ করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ বলেছেন, সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে বিতর্কিত করতে একটি গ্রুপ নানামুখী ষড়যন্ত্র করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

পুলিশ সূত্র বলছে, যুগোপযোগী পুলিশিং ব্যবস্থায় আগামীতে পুলিশের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- স্কুল অব কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ডকট্রিন অব ট্যাকটিস, কেন্দ্রীয় সাইবার সেন্টার, ট্যাকটিক্যাল প্রটেকশন স্কুল, ন্যাশনাল ট্যাকটিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুলিশ ইনোভেশন সেন্টার, স্কুল অব স্পেশাল উইপন অ্যান্ড ট্যাকটিস ও স্কুল অব বম্ব অ্যান্ড ব্যালিস্টিক সায়েন্স।