শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইঙ্গিত ও তৎপরতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আইনি পদক্ষেপ, নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এমনকি তার দেশে ফেরা ও আইনি মোকাবেলা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দুই বছরের মাথায় হঠাৎ করে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা কেন দিলেন সেটা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদ্বেগ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ভারতের দিল্লিতে বসে ইংরেজিতে একটি অডিও বার্তা দিয়েছেন। ওই অডিও বার্তাটিতে কোনো নতুনত্ব না থাকলেও নতুন করে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কেউ কেউ মনে করেন, শেখ হাসিনা যেহেতু আগামী ডিসেম্বরে দেশের ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন তাহলে তিনি সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করে বা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তার দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে কিছু বার্তা দিতে পারতেন, যেটি দল পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবে ভবিষ্যতে কাজে লাগত। সেরকমটি না হওয়ায় সকলের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, শেখ হাসিনার অডিও বার্তাটি এআই জেনারেটেড। এর একধাপ এগিয়ে গিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, শেখ হাসিনা সত্যিই বেঁচে আছেন কি না বা তিনি যদি বেঁচে থাকেন আদৌ ভারতের দিল্লিতে আছেন কি না বা দিল্লিতে যদি না থাকেন তাহলে তিনি কোথায় রয়েছেন- তার প্রকৃত অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

তবে সত্যিই নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরতে চান তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরবেন, কূটনৈতিক তৎপরতায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাকি ভারত ও তার সমর্থিত বড় রাষ্ট্রগুলোর চাপে এ দেশের সরকারের সাথে একটি সমঝোতার মাধ্যমে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন- রাজনৈতিক অঙ্গনে এরকম নানা আলোচনা চাওর আছে।

জুলাই গণহত্যার বিচার কোন পথে

জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। আদালত তাকে হত্যার নির্দেশ, উসকানি ও হত্যারোধে ব্যর্থতার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন। জুলাই গণহত্যার দায় মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা এখন ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের সাজা মাথায় নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা কি আদৌ দেশে ফিরবেন? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যখন পালিয়ে যান তখন তার দলের নেতাকর্মী এবং সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা কেউই বিষয়টি জানতেন না। তাদের বিপদের মুখে রেখে শুধু তার বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে দেশ ছাড়েন। আর এখনতো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার প্রতিকূলে এবং বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা ছাড়া ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধান জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তখনকার প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপটের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া : আওয়ামী লীগের একাংশ মনে করে, তার উপস্থিতি দলের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে, অন্য দিকে ছাত্র-জনতা ও বিরোধী পক্ষ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অস্থিরতার শঙ্কা : শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দেশীয় রাজনীতিতে নতুন সঙ্ঘাত বা উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে ও প্রকাশ্যে অবস্থান করা নেতাকর্মীদের মধ্যে অতি উৎসাহী মনোভাব কাজ করছে। যার ফলে অতি উৎসাহী পতিত দলের নেতাকর্মীদের পরিবারও একটি অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইনি চ্যালেঞ্জ : শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনি প্রক্রিয়া কী হতে পারে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা এখন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত হওয়ায় দেশে ফিরলেই তাকে আইনি মুখোমুখি হতে হবে এবং গ্রেফতারের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার দেশে ফেরার আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনবিদ ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান জানান, ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি যদি স্বেচ্ছায়ও দেশে ফিরে আসেন তাহলে দেশে প্রবেশ করামাত্রই তাকে গ্রেফতার করা হবে। এরপর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জন্য যে আইন আছে সেই অনুযায়ী তার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আরেকটি বিষয় হলো : আমরা জানি শেখ হাসিনা এখন ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ তিনি এখন পলাতক হিসেবে গণ্য। কেবল রাষ্ট্র যদি চায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে। এজন্য ভারতের সাথে আমাদের দেশের একটি বন্দী প্রত্যার্পণ আইন আছে। কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে সেটা সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবেন কি দেবেন না এটাও নির্ভর করছে ভারত সরকারের ওপর। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার বিচার চলাকালীন তাকে ফেরত চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে তখন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন সেটার অনুসরণ করা যেতে পারে।

ভারতের সাথে হওয়া “বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি”তে কী আছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে “বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি” (ঊীঃৎধফরঃরড়হ ঞৎবধঃু) স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির আওতায় দুই দেশ ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামিদের একে-অপরের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। ২০১৩ সালে চুক্তিটি হলেও ২০১৬ সালে এর কিছু সংশোধনী আনা হয়।

চুক্তির উদ্দেশ্য : পলাতক অপরাধীদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা। নিয়মকানুন : এই চুক্তির আওতায় কোনো আসামিকে ফেরত পেতে হলে নির্দিষ্ট প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। উভয় দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী বলছে?

আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার ঘোষণার সাথে সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমরা তো তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান বন্দী প্রত্যার্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকেও সংগঠন হিসেবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

কূটনৈতিক সমীকরণ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক : ভারতে তার উপস্থিতি ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের কড়া কূটনৈতিক অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে।

প্রত্যর্পণ ইস্যু : আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক দরকষাকষি আরো জটিল হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মত

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, শেখ হাসিনা কখনো এ দেশে আর ফিরবে না, ফেরাটাও সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে এরকম কিছু হাঁকডাক দেয় আলোচনায় থাকার জন্য, যাতে লোকজন তাদের ভুলে না যায়। মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই তাকে দেশের জনগণই পিটিয়ে মেরে ফেলবে- এমন আশঙ্কা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা বিদেশে পালিয়ে গেছেন তাদের দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে। এখন দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছেন, তারা এখন ঘর থেকে বের হবে, ঝটিকা মিছিল করবে আর এসবের কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করবে। শেখ হাসিনার এই উসকানির কারণে তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী গোপনে মিছিল মিটিং করতে গিয়ে বিপদে পড়বে, তাদের পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।