তারেক রহমানের সবুজ সঙ্কেত

বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল?

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন? সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, তারই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে বিএনপি থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন সেটিই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। বিএনপির পক্ষ থেকে দু’টি মনোনয়ন সংগ্রহ করা হয়েছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে কোনো চমক না থাকলে দলের মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। এ দিকে বিরোধী জোট ১১ দলের পক্ষ থেকে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমেদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও বিরোধী জোট থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারা জানান, আগামী বুধবার দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেড় যুগের বেশি সময় পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে, যিনি রাষ্ট্রের সঙ্কটময় মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরতে সক্ষম ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। কেননা দেশের যেকোনো সঙ্কটকালে রাষ্ট্রপতিকে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। মির্জা ফখরুল সেটি পারবেন বলে দলটি মনে করে। দেড় দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং কঠিন সময়ে দলের ঐক্য ধরে রাখার ভূমিকার কারণে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন ও রাজনৈতিক চাপেও বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। খালেদা জিয়া কারাবন্দী এবং তারেক রহমান বিদেশে অবস্থানকালে দেশে আন্দোলনের নেতৃত্বে দৃশ্যমান মুখ ছিলেন মির্জা ফখরুল। দলের ভেতরে ও বাইরে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং সংযত রাজনৈতিক আচরণও তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মির্জা ফখরুল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের কঠিন সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের বার্তা পৌঁছে দেয়া এবং মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তার সুচিন্তিত বক্তব্য ও শান্ত রাজনৈতিক কৌশল দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক মহলে তাকে একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার সমন্বয়ক ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ‘সাদামাটা ও সজ্জন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে সমধিক পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আজ পর্যন্ত মেলেনি। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক বিতর্কে শালীনতা বজায় রাখা এবং মার্জিত আচরণের জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। রাষ্ট্রপতির মতো আলঙ্কারিক ও নিরপেক্ষ ভারসাম্য বজায় রাখার পদের জন্য তার মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব মানানসই বলে মনে করেন অনেকে। যেহেতু রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো একক দলের নয় বরং তা রাষ্ট্রের। তিনি তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছেন, তিনি উগ্রবাদবিরোধী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক মহলেও তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য বৈশ্বিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে।

১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাস। তার বাবা মরহুম রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। তার বড় চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। দেশের বর্ষীয়ান নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম সাবেক শিক্ষক এবং অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য। ৭৯ বছর বয়সী এ নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধীরস্থির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাকে অভিভাবকত্বের আসনে বসানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছে।

বিএনপি মহাসচিবের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন এ প্রতিবেদককে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হতে এরই মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্মতি পাওয়া গেছে। তিনি জানিয়েছেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে মনোনয়ন দেন, তিনি সেটা সাদরে গ্রহণ করবেন। তিনি দলীয় প্রধানের এই সিদ্ধান্তকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছেন। দায়িত্ব পেলে তিনি সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে দেশের কল্যাণে কাজ করে যাবেন বলেও জানান।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তাকে সাংবিধানিক ও দলীয় বিধান অনুযায়ী বর্তমান মন্ত্রিত্ব ও বিএনপির মহাসচিদের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সাথে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অথবা যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে থাকতে পারেন। তবে দল চাইলে কাউন্সিল ছাড়াও কাউকে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নতুন মহাসচিব হতে পারেন। তার ছেড়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে আনা হবে।

মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আলোচনায় ছিল। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। সেটি তিনি গ্রহণ করেননি। তবে দেশের প্রয়োজনে তিনি সরকারের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

এ দিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দু’টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসি কার্যালয় থেকে ফরম দু’টি সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, একজন প্রার্থীর জন্যই ফরম নেয়া হয়েছে। তবে মনোনয়নপত্রে কোনো ধরনের ভুল-ত্রুটি থাকলে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য দু’টি ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নামে ফরম দু’টি সংগ্রহ করা হয়নি। তফসিল অনুযায়ী বিএনপি মনোনয়নপত্র জমা দেবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সেটি প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানই জানেন।

এ দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রোববার জোটটি লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। আজ তার পক্ষে নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হবে বলে জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও সংখ্যার হিসাব বলছে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে শেষ মুহূর্তে দলটি কি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বঙ্গভবনে পাঠাবে নাকি সবাইকে চমকে দিয়ে নতুন কোনো নাম ঘোষণা করবে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে মনোনয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়েই। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কেউই এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। সবাই বলছেন, সব জানেন তারেক রহমানই। দলের স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষমতা তার ওপর ন্যস্ত করেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এজন্য ইতোমধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে ভোটার তালিকা তথা সংসদ সদস্যদের নাম ইসি সচিবালয়ে পাঠানো হয়েছে। সচরাচর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিরোধী দল সাধারণত এ পদে প্রার্থী দেয় না। তাই ভোটাভুটির দরকার হয় না। যেহেতু এবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।