বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি, সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অবৈধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে হারে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। বিবাহ বিচ্ছেদ শুধু পরিবারের ভাঙন নয়; বিচ্ছেদের শিকার নারী-পুরুষের মনোজগতে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে। তেমনই তাদের সন্তান-সন্ততির বেড়ে ওঠাও সুখকর হয় না। এটি দেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার সাথে সামঞ্জস্যহীনও বটে।
গত রোববার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপড়েন ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যৌথ পরিবারে ভাঙনের পাশাপাশি একক পরিবারেও বিচ্ছেদ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে তালাকের আবেদনের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, শহরের তুলনায় বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে তালাকের হার বেশি। গ্রামে প্রতি হাজারে ১.১ জন এবং শহরে ০.৯ জন তালাকের শিকার। অন্যদিকে ঢাকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। একক শহর হিসেবে বিচ্ছেদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রাজধানীতে। ঢাকায় গড়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি তালাকের আবেদন জমা পড়ছে।
২০১৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এক দশকের সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ’২২ সাল থেকে তালাকের হার এক লাফে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। ২০১৫ থেকে ২০২১ পর্যন্ত তালাকের হার গড়ে প্রতি হাজারে ০.৬ থেকে ০.৭ জনের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। ২০২৪ থেকে চলতি বছরের বর্তমানে এই হার ১.১ থেকে ১.৪-এর মধ্যে ওঠানামা করছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের নানা কারণের মধ্যে রয়েছে নারীর স্বাবলম্বী হওয়া এবং শিক্ষা, সহনশীলতা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতার অভাব, যৌথ পরিবারের অবসান, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে আসক্তি, পরকীয়া সংক্রান্ত সন্দেহ বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মানুষ খুব সহজেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবকদের অনেকে পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় খোলামেলা জীবনের জন্য লালায়িত। পাশ্চাত্যের জীবন ধারাকেই অনেকে আদর্শ হিসেবে নিয়েছে।
বিশ্বায়নের যুগে গ্রাম ও শহর একাকার হয়ে গেছে। তথ্য-প্রযুুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো গ্রামের ছেলে-মেয়েদেরকে সহজেই আক্রান্ত করছে। অনেকে বিপথগামীও হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে দাম্পত্য জীবনেও।
বাংলাদেশ এমন এক ভূখণ্ডের নাম যার নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে। সেগুলোকে ধারণ করে ব্যক্তি ও সমাজ জীবন সুন্দর ও সুখকর করা সম্ভব। অন্যের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ কখনই কাম্য হতে পারে না। তাতে জীবন সুন্দর হওয়া দূরের কথা; বরং আরো অশান্তি ও হাহাকারই বয়ে আনতে পারে।
এই অবস্থা থেকে মানুষকে বের করে আনতে হলে প্রাচ্য জীবনাদর্শ ও পারিবারিক সংস্কৃতির সুফল এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিভিন্ন নেতিবাচক দিক সম্পর্কে তরুণদের ধারণা স্পষ্ট করার দরকার আছে। তথ্যপ্রযুক্তির কুফল সম্পর্কেও তাদের সচেতন করতে হবে। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত ও সুদৃঢ় করতে হবে। এজন্য শুধু সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে এমন নয়, দেশের সমাজবিজ্ঞানী, সামাজিক নেতৃবৃন্দ, আলেমসমাজ সবাইকে সক্রিয় হতে হবে। মিডিয়ার সহায়তাও জরুরি।