চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে : ডা: শফিক
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, একটি দেশ আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। দেশকে অস্থির করার জন্য দেশটি ২৪ ঘণ্টা পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। আমাদের উত্তেজিত হওয়া যাবে না, ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে হবে। দায়িত্বশীলদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
গাজীপুরের একটি মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর জেলা-মহানগরী আমির ও নায়েবে আমিরদের নিয়ে গত ৬ থেকে ৮ আগস্ট তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় শিক্ষাশিবিরের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। তারবিয়াত বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুমের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকীর সঞ্চালনায় শিক্ষাশিবিরে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও অধ্যক্ষ মো: শাহাবুদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. খলিলুর রহমান মাদানী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, জেলা আমিরসহ আমাদের দায়িত্বশীল ও রুকনদের সতর্ক হতে হবে। নিজের অবস্থান মূল্যায়ন করতে হবে। আল্লাহ মুসলমানদের বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা কখনো সহজ, কখনো কঠিন হয়। এটি তাঁর সুন্নাহ। মূলত মু’মিন জীবনের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য আল্লাহ তাআলা পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেন। এ পরীক্ষায় আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ত্যাগকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছায় সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন দায়িত্বশীলকে তাঁর কাছে তুলে নিয়েছেন। শীর্ষ দায়িত্বশীলসহ নেতাকর্মীদের ত্যাগ-কোরবানির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। আমাদের ত্যাগের তুলনায় কাশ্মির, ফিলিস্তিন ও মিসরের মুসলিমরা আরো বেশি কষ্ট স্বীকার করছেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জুলুম নির্যাতনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর আমরা ৩ ঘণ্টার জন্যও বসতে পারিনি। তিনদিনের কাজ আমরা ৩ ঘণ্টায় করেছি। অনেক সময় কাজ অসমাপ্ত রেখে বের হয়ে যেতে হয়েছে। এজন্য বাস্তবতার আলোকে এখন নিজেদের মূল্যায়ন করতে হবে। নিজের ঈমানকে মজবুত করতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী কুরআন ও সুন্নাহর গভীরে প্রবেশ করে উম্মাহর জন্য কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনিই যে সঠিক আর অন্যরা বেঠিক- আমরা তা মনে করি না। দ্বীনের জন্য তিনি সীমাহীন শ্রম দিয়ে গেছেন। তাঁর খুরধার লেখনীর মাধ্যমে তিনি বিশ্বে ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
জনশক্তিকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের আস্থার জায়গায় কেউ আঘাত দিলে তার দিকে তাকানো হবে না। সর্বোচ্চ নৈতিক মানে পৌঁছাতে সক্ষম না হলেও, ন্যূনতম নৈতিক মান বজায় রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির হালাল রুজি, পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, যেসব কাজে সন্দেহ থাকবে, তা থেকে দূরে থাকা ভালো। কারণ, শয়তান আমাদের সংগঠনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এজন্য একে অন্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ ফেতনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আমাদের উপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। বিদেশীরা উচ্চমূল্যে তাদের পণ্য আমাদের কিনতে বাধ্য করতে চায়, আর আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে তাদের করায়ত্ত করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদীদের বড় হাতিয়ার হলো মিডিয়া। সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে দু’টি প্রক্রিয়ায়। এর একটি হলো শিক্ষাকে ধ্বংস করে, আরেকটি হলো সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। এটি তারা করে মিডিয়ার মাধ্যমে। আমাদের সজাগ ও সাবধানে চলতে হবে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্ব একটি অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম বিশ্ব সবচেয়ে চাপে আছে। আগামীর বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ভর করছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের ফলাফলের উপর। আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে, পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক আগ্রাসন চলছে। এক্ষেত্রে আমরা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলার আহ্বান জানাচ্ছি। উম্মাহর স্বার্থে আমাদের ঐক্য কাম্য। মুসলমানদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সতর্ক থাকতে হবে, আল্লাহ চাইলে সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বিশ্বাসী। একই সাথে আমরা সকল দেশের সাথে সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক চাই।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, সংগঠনকে বিতর্কিত করতে যেকোনো ঘটনাকে শতগুণ বাড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, আল্লাহ চাইলে মোকাবেলা করা যাবে। তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলরা মানবিক হলে সংগঠন মানবিক রূপ লাভ করবে। গোটা দেশ মানবিক হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের প্রত্যাশার মঞ্জিলে পৌঁছে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক গণভোটের রায়কে বাস্তবায়ন না করে বিএনপি জনগণের সাথে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
এনডিএফর অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: মো: শফিকুর রহমান বলেছেন, বৈষম্য দূর করে সর্বত্র ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গতকাল রোববার ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত ‘জুলাই আপরাইজিং : জাস্টিস মেরিট ইউনিটি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে। তিনি বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের সেøাগানটাই ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। তিনি এনডিএফর চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের চাকরির মায়া না করে আপনারা জুলাই আন্দোলনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, সবকিছুকে রাজনৈতিক আয়না দিয়ে দেখা ঠিক নয়। যারা যোগ্য ও মেধাবী তাদের সর্বত্র নিযোগ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসকরা বিশেষ করে এনডিএফর চিকিৎসকরা কীভাবে স্বৈরাচারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে পুলিশ, আওয়ামী ক্যাডারদের নির্যাতনে ও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন সেই স্মৃতিচারণ করা হয় এবং এ বিষয়ক ভিডিও প্রদর্শনী করা হয়।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন এনডিএফর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা: মাহমুদ হোসেন। এর আগে জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে নিয়ে গবেষণার কিছু অংশ প্রদর্শন করা হয়। এই পর্বটি উপস্থাপন করেন ডা: নাহিদুজ্জামান সাজ্জাদ।
এনডিএফর কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা: মো: নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিকেলের অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাবেক নির্বাহী পরিচালক ডা: শেখ মহিউদ্দিন, নুরুন্নেসা সিদ্দিকা এমপি প্রমুখ।
ডা: মো: শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে যারা ক্ষমতাসীন তারা একটার পর একটা ভুল করে আসছে। তারা গণভোটকে অস্বীকার করে সংস্কার করতেও অস্বীকার করছে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন শেষ হয়নি, এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। গত সাড়ে ১৫ বছর যারা জুলুমের শিকার হয়েছে আজও তারা জুলুমের শিকার, তাদেরই আজ শাস্তিমুলক বদলী করে দেয়া হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জুলাইয়ের দাবি সংস্কার করতে চায় না। তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, চিকিৎসকরা জুলাই আন্দোলনে রাস্তা থেকে আহতদের তুলে এনে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে মানবিক কাজ করেছেন। আজ সেই মানবিক চিকিৎসকদেরই বদলী করে দেয়া হচ্ছে। তাদের পুরস্কর দেয়ার পরিবের্তে আজ তাদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে।
নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরাণ করেই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। জুলাই আন্দোলনের বড় সুবিধাপ্রাপ্ত এই সরকার ক্ষমতায় বসেই জুলাই গণভোটের দাবি বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করছে। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা মানে জুলাই আন্দোলনকারীদের সাথে প্রতারণা করা। সরকার যে চরম রাজনৈতিক ভুল করতে যাচ্ছে শিগগিরই এর মাসুল দিতে হবে।